জাতীয় ডেস্ক
গত বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) রাজধানীর আগারগাঁওয়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান ইসলামিক ফাউন্ডেশনে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমের বই বিতরণ করার উদ্বোধন করেছেন ধর্ম বিষয়ক সরকারি উপদেষ্টা ড. আ. ফ. ম. খালিদ হোসেন। সকাল ১০টায় ওই প্রতিষ্ঠান মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি প্রকাশিত বইগুলোর আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং কার্যক্রমের লক্ষ্য, সম্প্রসারণ পরিকল্পনা ও সরকারের সংশ্লিষ্ট নীতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করেন।
অনুষ্ঠানে মসজিদভিত্তিক শিশু শিক্ষা ও সাধারণ গণশিক্ষা কার্যক্রমে ব্যবহৃত বিভিন্ন বইয়ের বণ্টন কার্যক্রম শুরু করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এসব বই ঢাকার বিভিন্ন মসজিদ-সংলগ্ন শিক্ষা কেন্দ্রসহ অগ্রাধিকারের ভিত্তিতে দেশব্যাপী বিতরণ করা হবে বলে ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা গেছে। বইগুলোতে মূলত কুরআনিক তেলিম, আরবি বর্ণমালা, সাধারণ শিক্ষা উপকরণ ও ইসলামিক আদর্শ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
উদ্বোধনী বক্তব্যে ধর্ম উপদেষ্টা ড. খালিদ হোসেন বলেন, “সরকার শিশুদের নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণে বিশেষ মনোযোগ দিচ্ছে। মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রমের বই বিতরণ এরই একটি অংশ, যাতে ঘরে বসে যেখানে সময় থাকে সেখানে শিশু ও যুবএকাডেমিক ও নৈতিক মূল্যবোধের শিক্ষা একযোগে গ্রহণ করতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “এ কার্যক্রম দেশের সার্বিক শিক্ষার মান উন্নয়নে সাহায্য করবে এবং তরুণ প্রজন্মকে সঠিক ধর্মীয় জ্ঞানসহ নৈতিক চেতনা প্রদান করবে।”
ড. খালিদ হোসেন তার বক্তব্যে সরকারিভাবে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে কুরআনের তেলিম ও ইসলামিক শিক্ষা প্রসারে উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনার কথাও ঘোষণা করেন। তিনি বলেন, “বর্তমান সরকারের পরিকল্পনায় উচ্চশিক্ষার পর্যায়ে ইসলামিক স্টাডিজ, কুরআনিক গবেষণা ও সংশ্লিষ্ট কোর্স চালুর বিষয়টি সমন্বিতভাবে বিবেচনা হচ্ছে। এর ফলে শুধু মৌলিক ধর্মীয় জ্ঞান নয়, আন্তর্জাতিক মানসম্মত গবেষণা সুযোগও তৈরি হবে।” তিনি বলেন, “এতে দেশের তরুণ ইসলামিক স্কলারদের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মঞ্চেও কুরআনিক ও ইসলামী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা শক্তিশালী হবে।”
অনুষ্ঠানে আরও বলা হয়, সরকার অদূর ভবিষ্যতে ইমাম, আলেম ও বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রদের জন্য স্কলারশিপ প্রদান করবে এবং তাদেরকে বিশ্বের বিভিন্ন সম্মানিত বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা ও গবেষণার সুযোগ প্রদান করবে। এই স্কলারশিপ কার্যক্রমের আওতায় শিক্ষার্থীদের ভর্তিচ্ছু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ভর্তি, যাতায়াত, ভাতা ও গবেষণামূলক সহায়তা প্রদান হবে বলে ধর্ম উপদেষ্টা লিখিত বক্তব্যে উল্লেখ করেন।
ধর্ম উপদেষ্টা তার বক্তব্যে দেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেও কিছু মন্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, “অন্তর্বর্তী (ইন্টারিম) সরকার শৃঙ্খলা, সততা ও স্বাধীনতা বজায় রেখে একটি সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। দায়িত্বে থাকা সময়টুকুতে সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়নে সততা ও দক্ষতার সঙ্গে কাজ করার জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে।” তাঁর এই মন্তব্য রাজনৈতিক ব্যাখ্যার সুযোগ রেখে দিয়েছে যদিও অনুষ্ঠানে তা সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল বা কর্মসূচির বিস্তারিত উল্লেখ ছাড়াই বলা হয়।
ইসলামিক ফাউন্ডেশনের উপদেষ্টা পরিষদের প্রধান উপদেষ্টা দুইজন বিশেষ সহকারী, অধ্যাপক আলী রিয়াজ ও অধ্যাপক মনির হায়দার অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। তারা বই বিতরণ ও শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণ উদ্যোগের প্রশংসা করেন এবং বিভিন্ন এলাকার সাথে সমন্বয়ের বিষয়ে আলোচনা করেন। প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেছে, তাদের নেতৃত্বে একটি কমিটি তৈরি করা হয়েছে, যা কার্যক্রম বাস্তবায়ন, তদারকি এবং মান নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব পালন করবে।
ইসলামিক ফাউন্ডেশন ১৯৫৯ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, যার মূল উদ্দেশ্য ইসলামিক শিক্ষা, গবেষণা, প্রকাশনা এবং ধর্মীয় কর্মকাণ্ডের উদ্যোগ নিতে সহায়তা করা। প্রতিষ্ঠানের মতে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তাদের বরাদ্দ বাজেটের একটি অংশ মসজিদভিত্তিক শিক্ষা প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ হয়েছে, যার আওতায় বই সংকলন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ, পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, মসজিদভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম দেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ঐতিহ্যবাহী ধর্মীয় শিক্ষা ও আধুনিক শিক্ষার সংযোগ স্থাপনে সহায়ক হতে পারে, বিশেষ করে যারা প্রাথমিক পর্যায়ের শিক্ষা পূরণ করেননি বা বাইরে থেকে শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ কম পেয়েছেন। পাশাপাশি, সরকারি উচ্চশিক্ষা পর্যায়ে ইসলামিক শিক্ষা প্রসারের উদ্যোগ দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নে একটি অতিরিক্ত ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতে পারে, যদি তা সমন্বিত নীতিমালা ও পর্যাপ্ত বাজেট সহ বাস্তবায়িত হয়।
এদিকে শিক্ষা ও ধর্ম বিরোধী মতাদর্শের বিরুদ্ধেও সরকার বিভিন্ন সময়ে নীতিগত অবস্থান গ্রহণ করেছে, যাতে শিক্ষার্থীরা নৈতিকতার সঙ্গে সমসাময়িক জ্ঞান অর্জন করতে পারে। এসব প্রেক্ষাপটে মসজিদভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রম প্রসারের উদ্যোগ জাতীয় শিক্ষানীতি ও ধর্মীয় সমন্বয়ের একটি বাস্তবিক অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষানুরাগী, সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, ধর্মীয় নেতৃবৃন্দ এবং কার্যক্রম বাস্তবায়নে অংশগ্রহণকারী বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।