ধর্ম ডেস্ক
টঙ্গীর তুরাগতীরে দোয়ার মাধ্যমে শেষ হয়েছে তাবলিগ জামাত বাংলাদেশ শুরায়ি নেজামের অধীনে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী খুরুজের জোড়। রোববার (৪ জানুয়ারি) সকাল ৮টা ২৮ মিনিটে শুরু হয়ে ৮টা ৪৪ মিনিট পর্যন্ত চলে সমাপনী দোয়া। দোয়া পরিচালনা করেন তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের শীর্ষ মুরুব্বি মাওলানা মোহাম্মদ জুবায়ের, আর ‘আমিন… আমিন…’ ধ্বনিতে মুখরিত হয়ে ওঠে ইজতেমা ময়দান।
বাদ ফজর পাকিস্তানের শীর্ষ মুরুব্বি মাওলানা উবায়দুল্লাহ খুরশিদ হেদায়েতি বয়ান প্রদান করেন। তার বয়ানে আল্লাহর রাস্তায় বের হওয়া মুসল্লিদের জন্য ইসলামের মৌলিক দাওয়াত, আত্মশুদ্ধি, আখলাক উন্নয়ন, নামাজ ও আমলের ধারাবাহিকতা, উম্মাহর ঐক্য, সময়ের সদ্ব্যবহার এবং সফরকালীন দাওয়াতি কর্মপদ্ধতি বিষয়ে দিকনির্দেশনা তুলে ধরা হয়। বয়ানে কোরআন–হাদিসের আলোকে দাওয়াতি মেহনতের ইতিহাস, তাবলিগ জামাতের সূচনা, উপমহাদেশে এর বিস্তার, খুরুজের উদ্দেশ্য ও নিয়মতান্ত্রিক কর্মপরিকল্পনা বিশদভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।
তাবলিগ জামাত বাংলাদেশ শুরায়ি নেজামের মিডিয়া সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হানের তথ্যমতে, দোয়ায় অংশ নেন ৭২টি দেশ থেকে আগত প্রায় আড়াই হাজার বিদেশি মেহমান এবং দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা বিপুলসংখ্যক মুসল্লি। সমাপনী দিনে ঢাকা, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, নরসিংদী, কিশোরগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, টাঙ্গাইলসহ আশপাশের জেলাগুলো থেকে মুসল্লিদের ঢল নামে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে। আয়োজকরা জানান, এবারের খুরুজের জোড় শুরায়ি নেজামের সাংগঠনিক কাঠামো অনুযায়ী সম্পন্ন হয়েছে, যেখানে জামাত গঠন, বিদেশি অতিথিদের খেদমত, মুরুব্বিদের বয়ান, আমলি মশওয়ারা ও খুরুজের তালিকা প্রস্তুত—সব কার্যক্রম নিয়মতান্ত্রিকভাবে পরিচালিত হয়।
খুরুজের জোড় থেকে প্রায় ১,৫০০ জামাত আল্লাহর রাস্তায় বের হয়েছে। এসব জামাতে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, থাইল্যান্ড, দাগেস্তান, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়া, কানাডা, বেলজিয়াম, ফিলিপাইন, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুর, ইতালি, জাপান, সৌদি আরব, কাতার, দক্ষিণ আফ্রিকা, কুয়েত, ওমান, জর্ডান, শ্রীলঙ্কা, নেপাল, কিরগিজস্তান, মিয়ানমার, জাম্বিয়া, মোজাম্বিক, ভারত, পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশের মেহমানরা। বাংলাদেশ থেকেও ৬৪ জেলা থেকে প্রায় ১,৫০০ জামাত খুরুজে অংশ নিয়েছে। প্রতি জামাতে ৮–১২ জন সদস্য রাখা হয়েছে এবং জামাতগুলোকে দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন বিভাগ, জেলা, থানা ও প্রত্যন্ত অঞ্চলে ৪০ দিন, ৪ মাস এবং ১ বছরের দাওয়াতি সফরের জন্য পাঠানো হয়েছে। বিদেশি জামাতগুলোর জন্য ভিসা প্রক্রিয়া, সফরকালীন নিরাপত্তা পরামর্শ, যোগাযোগ সমন্বয় এবং আঞ্চলিক ভাষা-দক্ষ মুতারজিম (অনুবাদক) নির্ধারণ করা হয়েছে, যাতে স্থানীয় পর্যায়ে দাওয়াতি কাজ আরও ফলপ্রসূ হয়।
সমাপনী দোয়ায় মুসল্লিদের নিরাপত্তা, শৃঙ্খলা রক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পানি সরবরাহ, বিদেশি অতিথিদের খেদমত, তাবলিগের মেহনতের ধারাবাহিকতা, বিশ্ব উম্মাহর শান্তি, মুসলিম দেশগুলোর স্থিতিশীলতা, গাজা–ফিলিস্তিনসহ যুদ্ধকবলিত অঞ্চলের মুসলমানদের নিরাপত্তা, আলেম–ওলামা ও দাওয়াতি মেহনতকারীদের হেফাজত এবং বাংলাদেশের সার্বিক কল্যাণ কামনা করা হয়। দোয়ায় আল্লাহর সাহায্য, হেদায়েতের নূর, ঈমানি দৃঢ়তা, মুসলমানদের অন্তরে মহব্বত ও ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং দাওয়াতি কাজের মাধ্যমে সমাজে ইসলামের সঠিক বার্তা পৌঁছে দেওয়ার জন্য বিশেষ মোনাজাত করা হয়।
বাংলাদেশে তাবলিগ জামাতের খুরুজের জোড় মূলত বিশ্ব ইজতেমার প্রস্তুতিমূলক দাওয়াতি সমাবেশ হিসেবে বিবেচিত। এর মাধ্যমে দেশি–বিদেশি জামাতের সফরসূচি চূড়ান্ত করা হয়, মুরুব্বিদের আমলি পরামর্শ গ্রহণ করা হয় এবং দাওয়াতি কার্যক্রমের কৌশলগত সমন্বয় নির্ধারণ করা হয়। তুরাগ তীরের এই সমাবেশ প্রতিবছর মুসল্লিদের মধ্যে আমলি ও দাওয়াতি আগ্রহ বাড়ায় এবং ধর্মীয় কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাত্রা বৃদ্ধি করে।
এদিকে, জাতীয় নির্বাচনের পর ৫৯তম বিশ্ব ইজতেমা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সাধারণত বিশ্ব ইজতেমা আয়োজনের আগে আইনশৃঙ্খলা সংস্থা, স্থানীয় প্রশাসন, স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, ফায়ার সার্ভিস, সিটি করপোরেশন ও দাওয়াতি কাঠামোর সঙ্গে সমন্বয় সভা অনুষ্ঠিত হয়। ইজতেমা আয়োজন ঘিরে পরিবহন ব্যবস্থাপনা, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ, বিদেশি অতিথিদের ইমিগ্রেশন সহায়তা, জরুরি চিকিৎসা ক্যাম্প স্থাপন, অ্যাম্বুলেন্স সেবা, অগ্নিনির্বাপণ প্রস্তুতি, দুর্যোগকালীন উদ্ধার পরিকল্পনা, নদীতীরের নিরাপত্তা, খাবার ও পানি ব্যবস্থাপনা, বর্জ্য অপসারণ, টয়লেট ও অজু-খানার স্যানিটেশন, মুসল্লিদের থাকার খিত্তা ব্যবস্থাপনা, জামাতি তালিকা প্রস্তুত, মিডিয়া কাভারেজ শৃঙ্খলা এবং সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার একটি পূর্ণাঙ্গ রোডম্যাপ অনুসরণ করা হয়।
বিশ্লেষক ও ধর্মীয় গবেষকদের মতে, তাবলিগ জামাতের খুরুজের জোড় থেকে জামাতগুলো দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ায় স্থানীয় পর্যায়ে ধর্মীয় সচেতনতা বৃদ্ধি, মসজিদভিত্তিক আমলের পরিবেশ শক্তিশালী হওয়া, সামাজিক সম্প্রীতি জোরদার, মাদক–সহিংসতা থেকে তরুণদের দূরে রাখার প্রবণতা বৃদ্ধি এবং দাওয়াতি মেহনতের মাধ্যমে সমাজে ইতিবাচক ধর্মীয় চর্চার পরিসর সম্প্রসারিত হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়। তবে বড় সমাবেশের ক্ষেত্রে মুসল্লিদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা, নিরাপদ যাতায়াত, শীতকালীন আবহাওয়ার প্রস্তুতি, নদীর তীরবর্তী ঝুঁকি, ভিড় ব্যবস্থাপনা, জরুরি চিকিৎসা সহায়তা ও পরিচ্ছন্নতা—এসব বিষয় যথাযথ সমন্বয় ও প্রস্তুতির মাধ্যমে নিশ্চিত করা না হলে জনভোগান্তি ও অব্যবস্থাপনার ঝুঁকি থাকে, যা আয়োজক ও প্রশাসনের জন্য বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
৫৯তম বিশ্ব ইজতেমা কবে নাগাদ অনুষ্ঠিত হবে, বিদেশি অতিথিদের সংখ্যা, খিত্তা বিন্যাস, মুসল্লি ধারণক্ষমতা, ট্রাফিক পরিকল্পনা এবং প্রশাসনিক সমন্বয়ের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত পরবর্তী সময়ে আয়োজক কমিটি ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয় সভা শেষে জানানো হবে।