রাজধানী ডেস্ক
ঢাকা মহানগরীর মোহাম্মদপুর থানাধীন চন্দ্রিমা মডেল টাউনে একটি স্বর্ণালঙ্কারের দোকানে সংঘবদ্ধ চক্রের পরিকল্পিত চুরির ঘটনা ঘটেছে। রোববার (৪ জানুয়ারি) দিবাগত রাতে সংঘটিত এ ঘটনায় দোকানের লকার ভেঙে ৫০ ভরি স্বর্ণ ও ৫০০ ভরি রুপা চুরি করে নিয়ে গেছে দুর্বৃত্তরা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মোহাম্মদপুর জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার জুয়েল রানা সোমবার (৫ জানুয়ারি) দুপুরে এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, রোববার রাত ৩টা ২১ মিনিটে চন্দ্রিমা মডেল টাউনের ‘নিউ রানা জুয়েলার্স’ দোকানে মুখোশধারী একাধিক ব্যক্তি শাটার খোলার কৌশল ব্যবহার করে দোকানের ভেতরে প্রবেশ করে। প্রবেশের পর তারা দোকানে স্থাপিত মূল লকার ও স্বর্ণ-রুপা সংরক্ষণের বাক্স ভেঙে মূল্যবান ধাতু সংগ্রহ করে দ্রুত বেরিয়ে যায়। প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, চোরচক্র দোকানের তালা বা শাটার ভাঙার পরিবর্তে সেটি খোলার কৌশল রপ্ত করে দোকানে ঢোকে, যা তাদের পূর্বপ্রস্তুতি ও পেশাদার দক্ষতার ইঙ্গিত বহন করে।
অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার জুয়েল রানা ব্রিফিংয়ে জানান, চোরচক্রের সদস্য সংখ্যা তিন থেকে ছয় জনের মধ্যে হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাদের পরনে গ্লাভস, মাথায় মুখোশ এবং সাথে তালা খোলার বিশেষ যন্ত্র ছিল বলে সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণে প্রাথমিকভাবে অনুমান করছে তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা। ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে অপরাধস্থল ব্যবস্থাপনা দল (ক্রাইম সিন ইউনিট) আলামত সংগ্রহ করেছে। দোকানের শাটার খোলার পদ্ধতি, লকার ভাঙার কৌশল, বেরিয়ে যাওয়ার সময় ও পথ বিশ্লেষণ করে পুলিশ মনে করছে, চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে একই ধরনের চুরির সাথে জড়িত থাকতে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, চন্দ্রিমা মডেল টাউন এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম-নির্ভর হওয়ায় রাতে মাঝারি পর্যায়ের নিরাপত্তা ব্যবস্থা থাকলেও স্বর্ণের দোকানগুলোতে পেশাদার নিরাপত্তার সংখ্যা তুলনামূলক কম। অধিকাংশ দোকানে শাটার-ভিত্তিক তালা, অভ্যন্তরীণ লকার এবং সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা থাকলেও উন্নত পর্যায়ের অ্যালার্ম সিস্টেম বা সশস্ত্র নিরাপত্তা কর্মীর উপস্থিতি সীমিত। অপরাধ বিশ্লেষকরা মনে করেন, উচ্চমূল্যের ধাতু সংরক্ষণকারী প্রতিষ্ঠানে বহুমাত্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা—যেমন মোশন সেন্সর, সাইরেন-ভিত্তিক অ্যালার্ম, কেন্দ্রীয় মনিটরিং, সময়-লগড লকার, ইনফ্রারেড সেন্সর, এবং পর্যাপ্ত নিরাপত্তা কর্মী—থাকলে এ ধরনের চুরি প্রতিরোধের সম্ভাবনা বাড়ে।
ঢাকা মহানগরীতে গত কয়েক বছরে স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতু চুরির ঘটনা একাধিকবার সংঘটিত হয়েছে। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত পুলিশের বার্ষিক অপরাধ পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, রাজধানীর বিভিন্ন বাণিজ্যিক অঞ্চলে গভীর রাতে তালা খোলা বা লকার ভেঙে চুরির ঘটনাগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ মূল্যবান ধাতু, বৈদেশিক মুদ্রা, ইলেকট্রনিক্স ও নগদ অর্থ-সংক্রান্ত। এসব ঘটনার বেশিরভাগই সংঘবদ্ধ চক্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং চক্রগুলো সাধারণত রাত ২টা থেকে ৪টার মধ্যে অপরাধ সংঘটন করে, যাতে মানুষের চলাচল ও প্রতিরোধ-ঝুঁকি কম থাকে। মোহাম্মদপুর, ধানমন্ডি, মিরপুর, গুলশান, বাড্ডা ও যাত্রাবাড়ী এলাকায় স্বর্ণ-দোকান ও ছোট বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানে লকারভিত্তিক চুরি সংঘটনের প্রবণতা লক্ষ্য করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
তদন্ত কর্মকর্তারা জানান, ‘নিউ রানা জুয়েলার্স’ দোকানটিতে সিসিটিভি ক্যামেরা সচল ছিল। ক্যামেরার রেকর্ডে দেখা গেছে, চক্রটি দ্রুততার সাথে লকার ও বাক্স ভেঙে ধাতু সংগ্রহ করে বেরিয়ে যায়। অপরাধস্থলে ভাঙা লকার, বাক্স, ধাতু রাখার খালি কৌটা এবং শাটার খোলার চিহ্ন ছাড়া বড় ধরনের ভাঙচুরের চিহ্ন নেই। এতে বোঝা যায়, তারা ভেতরে অবস্থান করেছে স্বল্প সময়, সম্ভবত ৭ থেকে ১২ মিনিটের মধ্যে কাজ শেষ করেছে। পুলিশ তাদের সম্ভাব্য পালানোর পথ, নিকটস্থ সড়কের সিসিটিভি, মোটরসাইকেল বা যানবাহন ব্যবহারের সম্ভাবনা, মোবাইল টাওয়ার ডাম্প ডেটা এবং পূর্বে মোহাম্মদপুরে সংঘটিত অনুরূপ মামলার তথ্য পর্যালোচনা করছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মতে, স্বর্ণ-চুরির ঘটনাগুলো শুধু আর্থিক ক্ষতিই সৃষ্টি করে না, বরং স্থানীয় বাণিজ্যিক নিরাপত্তা ও বিনিয়োগ-পরিবেশেও প্রভাব ফেলে। ব্যবসায়ীরা নিরাপত্তা-ঝুঁকির কারণে বীমা প্রিমিয়াম বৃদ্ধি, দোকান পরিচালন ব্যয় বৃদ্ধি, এবং ক্রেতাদের আস্থার ওপর চাপ অনুভব করেন। অপরাধ দমন বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্বর্ণ ও মূল্যবান ধাতু সংরক্ষণের দোকানগুলোর জন্য বাধ্যতামূলক নিরাপত্তা নির্দেশিকা, নিয়মিত নিরাপত্তা অডিট, উন্নত অ্যালার্ম সিস্টেমে প্রণোদনা, এবং গভীর রাতে পুলিশের পেট্রোল টহল জোরদার করা হলে অপরাধ-ঝুঁকি কমানো সম্ভব।