আইন আদালত ডেস্ক
চট্টগ্রামের রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতঘরে পরিকল্পিতভাবে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে, যেখানে আগুন লাগানোর আগে ক্ষতিপূরণ হিসেবে বাড়ির মালিকদের হাতে টাকা বিতরণ করা হয়েছিল। পুলিশের তদন্ত ও গ্রেপ্তার আসামিদের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, এই ঘটনা একটি সংগঠিত ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে সংঘটিত হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গত ২ জানুয়ারি রাঙামাটির কলেজগেট এলাকা থেকে মনির হোসেন নামে এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থেকে আরও ছয়জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তারা হলেন—ওমর ফারুক, কবির হোসেন, কার্তিক দে, বিপ্লব বড়ুয়া, মোহাম্মদ লোকমান ও মো. পারভেজ। প্রতিটি ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িত এই আসামিরা পরিকল্পনা অনুযায়ী কয়েকটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের বসতঘরে আগুন লাগিয়েছে।
মনির হোসেনের স্বীকারোক্তি অনুযায়ী, আগুন দেওয়ার আগে বাড়ির মালিকদের হাতে ক্ষতিপূরণ হিসেবে মোট ১৩ লাখ টাকা বিতরণ করা হয়। একই সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ করিয়ে দেওয়া হয় এবং পেশাদার অপরাধীদের সহায়তা নেওয়া হয়। এই পরিকল্পনা অনুযায়ী হিন্দু, খ্রিস্টান, বৌদ্ধ ও পাহাড়ি সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে আগুন লাগানো হয়। আগুন দেওয়ার সময় বাড়ির লোকজনকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া হতো এবং পোষা প্রাণীও নিরাপদে রাখা হতো।
পুলিশ ও আদালতের তথ্য অনুযায়ী, গত ডিসেম্বর মাসে রাউজান ও রাঙ্গুনিয়ায় মোট পাঁচটি বসতঘরে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। ১৮ ডিসেম্বর রাউজানের কেউটিয়া বড়ুয়াপাড়া গ্রামে সাধন বড়ুয়ার বসতঘর ও গোয়ালঘরে আগুন দেওয়া হয়। পরদিন ঢেউয়াপাড়া গ্রামে দুটি হিন্দু বসতঘরে, এবং ২৩ ডিসেম্বর পশ্চিম সুলতানপুর গ্রামে সুখ শীল ও অনিলের বসতঘরে অগ্নিসংযোগ করা হয়। ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও কয়েকটি ঘর আংশিক এবং কয়েকটি সম্পূর্ণভাবে ভস্মীভূত হয়।
পুলিশ জানায়, ঘটনাস্থল থেকে উসকানিমূলক বক্তব্যসংবলিত ব্যানার উদ্ধার করা হয়েছে। ব্যানারে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্দেশ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার নাম এবং অর্ধশতাধিক মোবাইল নম্বর উল্লেখ ছিল। এছাড়া চারটি ব্যানার, দুটি কেরোসিন তেলের কনটেইনার, একটি কেরোসিন তেলের বোতল, কেরোসিন তেলমাখা একটি লুঙ্গি, একটি পুরনো কালো শার্ট, একটি মোবাইল ফোন, একটি সিএনজি চালিত অটোরিকশা এবং একটি মোটরসাইকেল জব্দ করা হয়েছে। এসব সরঞ্জাম অগ্নিসংযোগ এবং বিভিন্ন স্থানে যাতায়াতের কাজে ব্যবহার করা হয়েছিল।
চট্টগ্রামের রেঞ্জ পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক আহসান হাবিব পলাশ সংবাদ সম্মেলনে জানিয়েছেন, “রাতের আঁধারে এসব অগ্নিসংযোগ পরিকল্পিত ও ষড়যন্ত্রমূলক ছিল। এর মাধ্যমে দেশে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক মহলে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। ১৫–১৬ জনের একটি সংঘবদ্ধ চক্র এই ঘটনা বাস্তবায়নে সরাসরি জড়িত ছিল।”
মনির হোসেনের আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়, এই অগ্নিসংযোগের মাধ্যমে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করে পরিস্থিতিকে অস্থিতিশীল করা হয়েছিল। একই সঙ্গে আশা করা হয়েছিল, ভারতের মতো আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে এ বিষয়টি আলোচিত হবে এবং আন্তর্জাতিক চাপের মাধ্যমে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধ হবে।
রাউজান ও রাঙ্গুনিয়া থানায় তিনটি মামলা দায়ের করা হয়েছে। ঢেউয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা বিমল তালুকদার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দাবি করেছেন, গভীর রাতে আগুন লাগার পর পরিবারের সদস্যদের নিয়ে বাড়ি থেকে বের হতে হয়েছে। তিনি বলেন, আগুন দেওয়ার কারণ সম্পর্কে তিনি অবহিত নন।
এই ঘটনার পর প্রশাসন ও পুলিশ কর্মকর্তারা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা প্রদান করেছেন। পুলিশ জানায়, প্রতিটি ঘটনায় কেউ হতাহত হয়নি, তবে মালামাল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।