আইন আদালত ডেস্ক
আওয়ামী শাসনামলের সময় জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেলে (জেআইসি) গুম ও নির্যাতনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধ মামলার বিচার আজ (সোমবার) আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ শুরু হয়েছে। মামলায় ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে গঠিত তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেল মামলার সূচনা বক্তব্য উপস্থাপন ও প্রথম সাক্ষীর জবানবন্দির মধ্য দিয়ে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। প্যানেলের বাকি দুই সদস্য হলেন বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ এবং অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
মামলার প্রক্রিয়া গত ১৮ ডিসেম্বর আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হয়, যখন আসামিদের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হয়। অভিযোগে বলা হয়, জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেন্টারটি আয়নাঘরে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ২৬ জনকে গুম করা হয় এবং তাদের ওপর শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন চালানো হয়। আদালত এই ঘটনার ভিত্তিতে শেখ হাসিনা ও ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ মোট ১৩ আসামির বিরুদ্ধে পাঁচটি চার্জ গঠন করে।
প্রসিকিউটর শাইখ মাহদী জানান, মামলায় প্রসিকিউশনের পক্ষে ৪০ জনেরও বেশি সাক্ষীর নাম আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এই মামলা বাংলাদেশের ইতিহাসে গুমের বিষয়ে প্রথমবারের মতো বিচার প্রক্রিয়া চালু হওয়ার ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মামলায় গ্রেপ্তারকৃত তিনজন আসামি হলেন: ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল শেখ সরওয়ার হোসেন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান সিদ্দিকী এবং ব্রিগেডিয়ার জেনারেল আহমেদ তানভির মাজাহার সিদ্দিকী। পলাতক ১০ আসামির মধ্যে পাঁচজনই বিভিন্ন সময়ে ডিজিএফআইয়ের মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তারা হলেন লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আকবর হোসেন, মেজর জেনারেল (অব.) সাইফুল আবেদিন, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) সাইফুল আলম, লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) আহমেদ তাবরেজ শামস চৌধুরী এবং মেজর জেনারেল (অব.) হামিদুল হক।
বাকি পলাতক আসামিদের মধ্যে রয়েছে শেখ হাসিনার প্রতিরক্ষাবিষয়ক সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালক মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ তৌহিদুল উল ইসলাম, মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ এবং লেফটেন্যান্ট কর্নেল (অব.) মখছুরুল হক।
গত ৭ ডিসেম্বর অভিযোগ গঠনের ওপর শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। তিনি শুনানিতে বিস্তারিতভাবে বর্ণনা দেন যে, জেআইসি সেলে সরকারবিরোধী হিসেবে বিবেচিত ব্যক্তিদের কীভাবে তুলে নিয়ে গিয়ে গুম রাখা হতো এবং তাদের ওপর নির্যাতন চালানো হতো। প্রসিকিউটর ২০১৫ সালের ২২ অক্টোবর থেকে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট পর্যন্ত গুম হওয়া ২৬ জনের ঘটনা আদালতে উপস্থাপন করেন।
শুনানি শেষে চিফ প্রসিকিউটর মামলার আসামিদের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের আবেদন করেন। এর প্রেক্ষিতে ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে বিচার কার্যক্রমের জন্য তারিখ নির্ধারণ করে। এই মামলায় শুরু হওয়া বিচার প্রক্রিয়া দেশের মানবাধিকার ও গুম সংক্রান্ত ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।