আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড সংক্রান্ত নিজের অবস্থানের বিরোধিতা করলে ন্যাটো সদস্য ও ইউরোপীয় দেশগুলোর ওপর শুল্ক আরোপের হুমকি ‘১০০ শতাংশ বাস্তবায়ন’ করার ঘোষণা দিয়েছেন। এই পদক্ষেপের পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) জানিয়েছে, তারা নিজেদের স্বার্থ এবং সার্বভৌমত্ব রক্ষায় কঠোর অবস্থান বজায় রাখবে।
সোমবার (১৯ জানুয়ারি) এনবিসি নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাজ্যসহ ন্যাটো যুক্ত ইউরোপীয় দেশগুলো যদি গ্রিনল্যান্ড বিষয়ক যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থানের বিরোধিতা করে, তবে যুক্তরাষ্ট্রে রপ্তানি হওয়া তাদের সব পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপ করা হবে। তিনি জানান, আগামী ১ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাজ্য থেকে আমদানি হওয়া পণ্যের ওপর ১০ শতাংশ শুল্ক কার্যকর হবে এবং ১ জুন থেকে তা ২৫ শতাংশে উন্নীত করা হবে। ট্রাম্প আরও উল্লেখ করেন, ডেনমার্ক থেকে গ্রিনল্যান্ড কেনার বিষয়ে ওয়াশিংটনের সঙ্গে সমঝোতা না হওয়া পর্যন্ত এই শুল্ক বহাল থাকবে। একই নীতি ডেনমার্ক, নরওয়ে, সুইডেন, ফ্রান্স, জার্মানি, নেদারল্যান্ডস ও ফিনল্যান্ডের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য হবে।
এই ঘোষণার প্রতিক্রিয়ায় ইউরোপীয় দেশগুলো একজোট অবস্থান নিয়েছে। ডেনমার্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী লার্স লোক্কে রাসমুসেন বলেন, হুমকি দিয়ে কোনো দেশ গ্রিনল্যান্ডের মালিকানা দাবি করতে পারবে না। তিনি যুক্তরাষ্ট্রকে সতর্ক করে বলেন, কিছু ‘লাল রেখা’ রয়েছে, যা অতিক্রম করা অনুচিত। যুক্তরাজ্যের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইয়েভেট কুপারও স্পষ্ট করে জানিয়েছেন, গ্রিনল্যান্ডের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার কেবল গ্রিনল্যান্ডবাসী ও ডেনমার্কের।
সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের ক্ষেত্রে সামরিক শক্তি ব্যবহারের সম্ভাবনা পুরোপুরি বাতিল করেননি। এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য নেই।” তবে ডেনমার্ক সতর্ক করেছে, গ্রিনল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের সম্ভাব্য সামরিক পদক্ষেপ ন্যাটোর জন্য গুরুতর পরিণতি ডেকে আনতে পারে। ন্যাটোর মহাসচিব মার্ক রুটে জানিয়েছেন, আর্কটিক অঞ্চলের নিরাপত্তা বিষয়ে জোটটি ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ডের সঙ্গে সমন্বয় বজায় রাখবে। ইউরোপের কিছু দেশ প্রতীকী উপস্থিতি হিসেবে গ্রিনল্যান্ডে সীমিতসংখ্যক সেনা মোতায়েন করেছে।
ইইউর পররাষ্ট্রনীতিবিষয়ক প্রধান কাজা কালাস বলেন, “আমরা সংঘাতে যেতে চাই না, তবে নিজেদের অবস্থান থেকে সরে আসব না। বাণিজ্যিক হুমকি সমাধান নয়—সার্বভৌমত্ব কখনো বাণিজ্যের বিষয় হতে পারে না।” এই প্রেক্ষাপটে গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে করণীয় নির্ধারণের জন্য আগামী বৃহস্পতিবার ব্রাসেলসে ইইউ নেতাদের জরুরি বৈঠক ডাকা হয়েছে।
এদিকে ট্রাম্প ও নরওয়ের প্রধানমন্ত্রী ইয়োনাস গার স্টোরের মধ্যে বার্তা বিনিময়ও প্রকাশ পেয়েছে। সেখানে ট্রাম্প নোবেল শান্তি পুরস্কার না পাওয়ার জন্য নরওয়েকে দায়ী করেন। জবাবে স্টোর জানান, নোবেল পুরস্কার একটি স্বাধীন কমিটির মাধ্যমে প্রদান করা হয়, নরওয়ে সরকার নয়। তিনি আরও বলেন, গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের রাজ্যের অংশ এবং নরওয়ে এ বিষয়ে ডেনমার্কের অবস্থানকে পূর্ণ সমর্থন করে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, নর্থ আমেরিকান অ্যারোস্পেস ডিফেন্স কমান্ড (নোরাড) গ্রিনল্যান্ডের পিটুফিক স্পেস বেসে একাধিক বিমান পাঠিয়েছে। তবে নোরাড জানিয়েছে, এটি পূর্বপরিকল্পিত নিয়মিত কার্যক্রম এবং ডেনমার্ক ও গ্রিনল্যান্ড কর্তৃপক্ষকে আগেই জানানো হয়েছিল। অতীতে ২০২২, ২০২৩ ও ২০২৪ সালে একই ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে।
এই পরিস্থিতি আর্কটিক অঞ্চলে নিরাপত্তা, বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক হুমকি এবং ইউরোপীয় দেশগুলোর সংহত প্রতিক্রিয়া দুই পক্ষের মধ্যে টেকসই সমঝোতার প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরছে।