নিজস্ব প্রতিবেদক
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনায় সুযোগ পেলে তার দল দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ বা শূন্য সহনশীলতা নীতি কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করবে। তিনি উল্লেখ করেন, অতীতে জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পালনকালে সততা ও স্বচ্ছতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, ভবিষ্যতে সেই ধারাবাহিকতা বজায় রেখে একটি ইনসাফভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ করা হবে।
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে ২০২৬ সালের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আয়োজিত ‘পলিসি সামিট ২০২৬’-এ মূল প্রবন্ধ (কি-নোট) উপস্থাপনকালে তিনি এসব কথা বলেন। সম্মেলনে দলের ভবিষ্যৎ রাষ্ট্রদর্শন, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং সুশাসন নিয়ে জামায়াত আমিরের লিখিত বক্তব্য পাঠ করা হয়।
লিখিত বক্তব্যে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ১৯৪৭ সালে ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা অর্জনের মূল লক্ষ্য ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক মুক্তি। তবে স্বাধীনতার পাঁচ দশক পেরিয়ে গেলেও সেই গণতান্ত্রিক ও মানবিক আকাঙ্ক্ষাগুলো এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। বিশেষ করে গত দেড় দশকেরও বেশি সময় ধরে শাসনব্যবস্থার অব্যবস্থাপনা এবং কর্তৃত্ববাদী আচরণের ফলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং সংকুচিত হয়েছে সাধারণ নাগরিকের গণতান্ত্রিক অধিকার।
দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করে জামায়াত আমির বলেন, “আমরা এখন এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছি। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি দৃশ্যমান হলেও কর্মসংস্থানের অভাব এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলেছে। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণরা তাদের যোগ্যতানুযায়ী কর্মসংস্থান খুঁজে পেতে হিমশিম খাচ্ছে।” তিনি কেবল গাণিতিক প্রবৃদ্ধির পরিবর্তে মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন এবং সামাজিক মর্যাদাকে উন্নয়নের মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান।
বিদেশে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের অবদানের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি। তারা শুধু অর্থ পাঠান না, বরং আন্তর্জাতিক দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা দিয়ে দেশের উন্নয়নে অংশ নিতে আগ্রহী। প্রবাসীদের নাগরিক অধিকার ও কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব বলে তিনি মন্তব্য করেন। পাশাপাশি দেশের অর্ধেক জনশক্তি নারীদের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক কর্মকাণ্ডে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি। তিনি বলেন, নারীদের বাদ দিয়ে টেকসই অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন অসম্ভব।
দুর্নীতি প্রসঙ্গে দলের অনড় অবস্থানের কথা পুনর্ব্যক্ত করে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, “আমরা আগেও প্রমাণ করেছি যে ক্ষমতার শীর্ষ পর্যায়ে থেকেও দুর্নীতিমুক্ত থাকা সম্ভব। আমাদের দলের সাবেক আমির ও সেক্রেটারি জেনারেল অতীতে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় পরিচালনা করেছেন এবং সততার অনন্য দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন। প্রশাসনিক দক্ষতা ও নৈতিকতার সেই সমন্বয়ই আমাদের আগামী দিনের পথচলার পাথেয় হবে।”
বক্তব্যের শেষাংশে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের শহীদদের স্মরণ করে তিনি বলেন, আবু সাঈদ, মুগ্ধসহ অগণিত শহীদের রক্ত বৃথা যেতে দেওয়া হবে না। তরুণ প্রজন্মের আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে একটি বৈষম্যহীন, সমতাভিত্তিক ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গড়তে জামায়াতে ইসলামী অঙ্গীকারবদ্ধ।
সামিটে রাজনৈতিক বিশ্লেষক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি এবং দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন। সেখানে আগামী নির্বাচনের রূপরেখা ও জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গঠনে দলের বিভিন্ন নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।