নিজস্ব প্রতিবেদক
রাজধানীতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর উদ্যোগে আয়োজিত ‘পলিসি সামিট ২০২৬’-এ যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, চীন, ভারত ও পাকিস্তানসহ বিশ্বের প্রায় ৩০টি দেশের প্রতিনিধি অংশগ্রহণ করেছেন। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর একটি অভিজাত হোটেলে এই আন্তর্জাতিক সম্মেলন শুরু হয়। সম্মেলনে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় একটি স্থিতিশীল, সমৃদ্ধ ও ন্যায়বিচারভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের লক্ষে দলটির ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মপরিকল্পনা বা রূপরেখা উপস্থাপন করা হয়েছে।
দলটির আন্তর্জাতিক বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, মঙ্গলবার সকাল থেকেই বিভিন্ন দেশের কূটনীতিক ও প্রতিনিধিরা অনুষ্ঠানস্থলে উপস্থিত হতে শুরু করেন। আমন্ত্রিত অতিথিদের তালিকায় ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ), জার্মানি, ফ্রান্স, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, ইরান, মালয়েশিয়া, তুরস্ক, মালদ্বীপ, ব্রুনাই ও শ্রীলঙ্কাসহ গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র ও সংস্থার প্রতিনিধিরা রয়েছেন। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের এই ব্যাপক উপস্থিতি বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা।
সামিটের উদ্বোধনী অধিবেশনে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। তিনি তার বক্তব্যে দেশের বর্তমান অবস্থাকে একটি ‘গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণ’ হিসেবে অভিহিত করেন। তিনি বলেন, বাংলাদেশের প্রধান চ্যালেঞ্জ এখন কেবল টিকে থাকা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা। বিশেষ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের গণতান্ত্রিক ধারাকে টেকসই করতে জামায়াত একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জনমুখী রূপরেখা বাস্তবায়নে অঙ্গীকারবদ্ধ।
দেশের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরে ডা. শফিকুর রহমান বলেন, বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাস দীর্ঘ ও অমীমাংসিত সংগ্রামের ইতিহাস। ১৯৪৭ সালের ঔপনিবেশিক শাসন থেকে মুক্তি এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মূল চেতনা ছিল সামাজিক ন্যায়বিচার, মানবিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক মুক্তি। কিন্তু স্বাধীনতার পাঁচ দশক পার হলেও জনসাধারণের সেই প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়ে গেছে। গত ১৭ বছরের শাসনব্যবস্থাকে ‘কর্তৃত্ববাদী’ হিসেবে আখ্যায়িত করে তিনি বলেন, দীর্ঘ সময় ধরে জবাবদিহির অভাব এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিকল্পিতভাবে দুর্বল করার ফলে নাগরিকদের মৌলিক অধিকার ও কণ্ঠস্বর রুদ্ধ করা হয়েছে।
বিগত সরকারের সমালোচনা করে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শাসনের নামে দীর্ঘকাল ধরে চলা অব্যবস্থাপনার ফলে দেশে এক অন্ধকার অধ্যায় তৈরি হয়েছিল। তবে ২০২৪ সালের জুলাই মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান এবং তরুণ প্রজন্মের সাহসী অবস্থান নাগরিকদের অধিকার ও ভবিষ্যৎ পুনরুদ্ধারের নতুন পথ খুলে দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দাঁড়িয়েই জামায়াত তাদের নতুন বাংলাদেশের রূপরেখা তৈরি করেছে, যেখানে রাজনৈতিক সংস্কারের পাশাপাশি অর্থনৈতিক উন্নয়নের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়, সাম্য ও ইনসাফের ভিত্তিতে একটি বৈষম্যহীন সমাজ গঠনই দলটির মূল লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা আন্তর্জাতিক মিত্রদের সহযোগিতা ও বিনিয়োগের আহ্বান জানান। জামায়াতের এই পলিসি সামিট মূলত দেশি-বিদেশি অংশীদারদের সাথে সংলাপ বৃদ্ধি এবং আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটি ঐক্যবদ্ধ প্ল্যাটফর্ম তৈরির প্রয়াস। সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া এবং অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা নিয়ে তাদের নিজস্ব পর্যবেক্ষণ ও আগ্রহের কথা ব্যক্ত করেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের আগে এই ধরনের আন্তর্জাতিক সম্মেলন আয়োজন করে জামায়াতে ইসলামী একদিকে যেমন তাদের কূটনৈতিক দক্ষতা প্রদর্শন করেছে, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মহলের কাছে নিজেদের আধুনিক ও গণতান্ত্রিক ভাবমূর্তি তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে দলটির অংশগ্রহণ এবং নীতিগত অবস্থান পরিষ্কার করার ক্ষেত্রে এই সামিট একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সম্মেলন শেষে একটি যৌথ ঘোষণাপত্র বা সুপারিশমালা গৃহীত হওয়া