রাজধানী ডেস্ক
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) দুই বছরের আগে বাড়িভাড়া বৃদ্ধি করা যাবে না—এমন নির্দেশনা জারি করেছে। একই সঙ্গে ভাড়াটিয়াদের প্রতি মাসের ভাড়া ১০ তারিখের মধ্যে পরিশোধ এবং বাড়িওয়ালাদের লিখিত রশিদ প্রদান বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি) গুলশান-২ নগর ভবনে ‘ঢাকার বাড়িভাড়া সংক্রান্ত নির্দেশিকা প্রকাশ’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে ডিএনসিসির প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ এসব সিদ্ধান্তের কথা জানান।
সংবাদ সম্মেলনে ডিএনসিসির প্রশাসক বলেন, বছরের শুরুতেই ভাড়া বাড়ানোর যে প্রচলন গড়ে উঠেছে, তা যৌক্তিক নয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, বাড়িভাড়া বৃদ্ধির সময় হওয়া উচিত অর্থবছরের শুরুতে, অর্থাৎ জুন-জুলাই মাসে। তিনি আরও বলেন, বাড়িভাড়ার ওপর ভিত্তি করেই সিটি করপোরেশন কর আদায় করে; ফলে কর বৃদ্ধির হার বিবেচনায় নিয়ে ভাড়া নির্ধারণ করাই যুক্তিসংগত।
ডিএনসিসির পক্ষ থেকে জানানো হয়, বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১-এর আলোকে এই নির্দেশনাগুলো প্রণয়ন করা হয়েছে। নির্দেশনায় বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়ার অধিকার ও দায়িত্ব স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে, যাতে ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ কমে আসে এবং নগরবাসীর আবাসন ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা নিশ্চিত হয়।
নির্দেশনা অনুযায়ী, বাড়ির মালিককে তার ভবন বসবাসের উপযোগী রাখতে হবে এবং গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানিসহ সব ইউটিলিটি সংযোগ নিরবচ্ছিন্নভাবে নিশ্চিত করতে হবে। দৈনিক গৃহস্থালি বর্জ্য সংগ্রহসহ প্রয়োজনীয় নাগরিক সেবা বজায় রাখার দায়িত্বও বাড়িওয়ালার। এসব সেবায় কোনো সমস্যা দেখা দিলে ভাড়াটিয়া বাড়িওয়ালাকে অবহিত করবেন এবং বাড়িওয়ালা তা দ্রুত সমাধান করবেন।
পরিবেশবান্ধব নগর গঠনের লক্ষ্যে নির্দেশনায় বাড়ির ছাদ, বারান্দা ও সামনের উন্মুক্ত স্থানে সবুজায়নের কথা বলা হয়েছে। বাড়িওয়ালার পূর্বানুমোদন সাপেক্ষে ভাড়াটিয়াও এ কাজে অংশ নিতে পারবেন। একই সঙ্গে সাম্প্রতিক অগ্নিকাণ্ড, ভূমিকম্পসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনার প্রেক্ষাপটে নিরাপত্তা জোরদারে ছাদ ও মূল গেটের চাবি শর্তসাপেক্ষে ভাড়াটিয়াদের সরবরাহ করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
ভাড়া পরিশোধ সংক্রান্ত বিষয়ে বলা হয়েছে, ভাড়াটিয়াকে প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে ভাড়া দিতে হবে। এর বিপরীতে বাড়িওয়ালাকে প্রতিমাসে ভাড়াটিয়াকে স্বাক্ষরযুক্ত লিখিত রশিদ প্রদান করতে হবে। ভাড়াটিয়ার যেকোনো সময় বাড়িতে প্রবেশাধিকার সংরক্ষিত থাকবে এবং নিরাপত্তা বা শৃঙ্খলা রক্ষায় বাড়িওয়ালা কোনো ব্যবস্থা নিলে তা বাস্তবায়নের আগে ভাড়াটিয়ার মতামত গ্রহণ করতে হবে।
ভাড়া বৃদ্ধির ক্ষেত্রে নির্দেশনায় স্পষ্ট করা হয়েছে, নির্ধারিত মানসম্মত ভাড়া কার্যকর হওয়ার তারিখ থেকে দুই বছর পর্যন্ত অপরিবর্তিত থাকবে। এই সময়ের আগে কোনো অবস্থাতেই ভাড়া বাড়ানো যাবে না। দুই বছর পর ভাড়া পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে তা দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে এবং জুন-জুলাই মাসে কার্যকর করা যাবে। একই সঙ্গে মানসম্মত ভাড়ার বার্ষিক পরিমাণ সংশ্লিষ্ট এলাকার বাজারমূল্যের ১৫ শতাংশের বেশি হতে পারবে না।
ভাড়াটিয়া নির্দিষ্ট সময়ে ভাড়া পরিশোধে ব্যর্থ হলে প্রথমে মৌখিক সতর্কতা, পরে লিখিত নোটিশ দেওয়ার বিধান রাখা হয়েছে। বকেয়া পরিশোধ না করলে দুই মাসের নোটিশ দিয়ে ভাড়া চুক্তি বাতিল এবং উচ্ছেদের সুযোগ রাখা হয়েছে। আবাসিক ভবনের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষ দুই মাসের নোটিশ দিয়ে ভাড়ার চুক্তি বাতিল করতে পারবেন।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়েছে, ভাড়া চুক্তি অবশ্যই লিখিত হতে হবে এবং এতে ভাড়া বৃদ্ধির শর্ত, অগ্রিম জমা, চুক্তির মেয়াদ ও বাড়ি ছাড়ার নিয়ম স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে। বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় এক থেকে তিন মাসের বেশি অগ্রিম ভাড়া নেওয়া যাবে না।
বাড়িভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির জন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় ওয়ার্ডভিত্তিক বাড়িওয়ালা সমিতি ও ভাড়াটিয়া সমিতি গঠনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে এসব সমিতির মাধ্যমে সমস্যা সমাধানের চেষ্টা করা হবে। তাতে সমাধান না হলে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট জোনের আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে বিষয়টি জানানো যাবে।
ডিএনসিসি জানিয়েছে, ভাড়াটিয়ার অধিকার নিশ্চিত করতে বাড়িভাড়া নিয়ন্ত্রণ আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী প্রণীত এই নির্দেশিকা বাস্তবায়নে সচেতনতা কার্যক্রম চালানো হবে। প্রয়োজনে জোনভিত্তিক মতবিনিময় ও আলোচনা সভার মাধ্যমে বাড়িওয়ালা ও ভাড়াটিয়াদের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা হবে।