অনলাইন ডেস্ক
বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যু ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে তীব্র প্রতিক্রিয়া ও অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগের উত্তাপ ছড়িয়ে পড়েছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেছেন, খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসা নিতে না দিয়ে পরিকল্পিতভাবে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যা তার ভাষায় ‘হত্যার শামিল’। তিনি আরও বলেছেন, এই ঘটনার রাজনৈতিক দায় থেকে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কখনো মুক্তি পাবেন না।
বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকাল পৌনে ৩টার দিকে খালেদা জিয়ার জানাজার আগে তার জীবন ও রাজনৈতিক কর্মপরিক্রমা নিয়ে বক্তব্য দিতে গিয়ে এসব মন্তব্য করেন নজরুল ইসলাম খান। ঢাকায় অনুষ্ঠিত এই শোক সমাবেশে দলের শীর্ষ নেতাকর্মী, সমর্থক, বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ এবং খালেদা জিয়ার শুভানুধ্যায়ীরা উপস্থিত ছিলেন। বক্তব্যের শুরুতেই নজরুল ইসলাম খান খালেদা জিয়ার একটি উল্লেখযোগ্য উক্তি স্মরণ করিয়ে দেন— “বিদেশে আমাদের বন্ধু আছে, কোনো প্রভু নেই।” তিনি বলেন, এই উক্তি বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি ও আত্মমর্যাদাভিত্তিক রাজনীতির এক দৃঢ় প্রতিফলন।
নজরুল ইসলাম খান তার বক্তব্যে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি থেকে খালেদা জিয়ার কারাবাসের প্রসঙ্গ তুলে বলেন, সম্পূর্ণ সুস্থ অবস্থায় তিনি কারাগারে প্রবেশ করেছিলেন। কিন্তু দুই বছরের বেশি সময় নির্জন কারাগারে থাকার সময় পর্যাপ্ত চিকিৎসা সুবিধা না পাওয়ায় তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে। তিনি উল্লেখ করেন, কারাগারে প্রবেশের সময় খালেদা জিয়া হেঁটে গিয়েছিলেন; কিন্তু মুক্তি পাওয়ার সময় তিনি গুরুতর অসুস্থ অবস্থায় বের হন, যা দেশবাসী প্রত্যক্ষ করেছে। এই সময়টিকে তিনি ‘চিকিৎসা বঞ্চনার অধ্যায়’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন।
বিএনপির এই নীতিনির্ধারক আরও বলেন, পরবর্তী চার বছর গৃহবন্দি থাকা অবস্থায় দেশ-বিদেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী তাকে বিদেশে নিয়ে উন্নত চিকিৎসা দেওয়ার প্রয়োজন ছিল। কিন্তু সেই সুযোগ দেওয়া হয়নি। তিনি দাবি করেন, আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতনামা চিকিৎসকরা একাধিকবার মত দিয়েছেন যে, উন্নত চিকিৎসা পেলে তার শারীরিক জটিলতা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব ছিল। কিন্তু তাকে দেশের বাইরে নেওয়ার অনুমতি না দেওয়ায় অসুস্থতা ধীরে ধীরে মারাত্মক রূপ ধারণ করে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এটি কোনো বিচ্ছিন্ন প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং রাজনৈতিক প্রতিহিংসা ও প্রতিপক্ষকে দুর্বল করে দেওয়ার কৌশলের অংশ ছিল।
নজরুল ইসলাম খান অভিযোগ করেন, ২০১৮ থেকে ২০২২ সাল পর্যন্ত সময়জুড়ে চিকিৎসা সংকটকে রাজনৈতিক অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তার বক্তব্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন তৎকালীন সরকার খালেদা জিয়ার কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব এবং চিকিৎসা অনুমতি সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনাকে প্রাধান্য দিয়েছে। তিনি বলেন, আইনি কাঠামোর আড়ালে এই সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হলেও বাস্তবে তার ফলাফল দাঁড়িয়েছে চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত করে একজন জাতীয় নেত্রীকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া।
বক্তব্যে নজরুল ইসলাম খান খালেদা জিয়ার জন্ম ও পারিবারিক পরিচয় নিয়েও আলোকপাত করেন। তিনি জানান, ১৯৪৫ সালের ১৫ আগস্ট খালেদা জিয়ার জন্ম। তার পৈতৃক নিবাস ফেনী জেলার ফুলগাজী উপজেলার দক্ষিণ দৌলতপুর গ্রামে। শৈশব ও কৈশোর কেটেছে চট্টগ্রামে। ১৯৬০ সালে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন তিনি। জিয়াউর রহমানের সেনা কর্মকর্তা থেকে রাষ্ট্রনায়ক হয়ে ওঠার যাত্রায় খালেদা জিয়া ছিলেন নীরব কিন্তু দৃঢ় সহযাত্রী। ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর ধীরে ধীরে সক্রিয় রাজনীতিতে প্রবেশ করেন এবং ১৯৮৪ সালে বিএনপির নেতৃত্বে উঠে আসেন। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে বিএনপির বিজয়ের মাধ্যমে প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন তিনি। পরবর্তী সময়ে ১৯৯৬ ও ২০০১ সালের নির্বাচনেও গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ভূমিকা পালন করেন।
নজরুল ইসলাম খানের বক্তব্যে বারবার উঠে এসেছে চিকিৎসা বঞ্চনা, কারাবাস, গৃহবন্দিত্ব, রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, গণতান্ত্রিক অধিকার, এবং মানবিক সিদ্ধান্তের অভাবের প্রসঙ্গ। তবে তার এসব বক্তব্য ছিল দলের অবস্থান ব্যাখ্যা ও অভিযোগ উপস্থাপনের মধ্যে সীমাবদ্ধ, কোনো ব্যক্তিগত আক্রমণ বা উত্তেজনা তৈরির আহ্বান এতে ছিল না। বক্তব্যে খালেদা জিয়াকে ‘অপরাজেয়’, ‘অদম্য’ এবং ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতীক’ হিসেবে বর্ণনা করা হলেও এটি ছিল দলের শোকভাষ্যের অংশ, যা রাজনৈতিক বক্তব্যে স্বাভাবিকভাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে।
খালেদা জিয়ার মৃত্যু ঘিরে রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, তা দেশের সমসাময়িক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হিসেবে আলোচিত হচ্ছে। তার অসুস্থতার চিকিৎসা অনুমতি, কারাবাস ও গৃহবন্দিত্বকালীন সিদ্ধান্তগুলো ভবিষ্যতে রাজনৈতিক ও আইনি বিশ্লেষণের অংশ হয়ে থাকবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিএনপি নেতাদের অভিযোগের বিপরীতে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া না এলেও রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।
এই শোকাবহ ঘটনার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে নেতৃত্ব, মানবিক সিদ্ধান্ত, আইনি কাঠামো, চিকিৎসা অধিকার, এবং রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অভিযোগের বিষয়গুলো নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।