জেলা প্রতিনিধি
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় পুলিশের বিশেষ অভিযান ‘ডেভিল হান্ট ফেজ–২’ এর আওতায় নিষিদ্ধ ঘোষিত রাজনৈতিক সংগঠনের দুই নেতাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বুধবার (৩১ ডিসেম্বর) বিকেলে উপজেলার পৃথক স্থান থেকে তাদের আটক করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন গোবিন্দগঞ্জ থানা পুলিশের উপ-পরিদর্শক (এসআই) হারুনর রশিদ এবং সহকারী উপ-পরিদর্শক (এএসআই) আলামিন। গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তিরা হলেন তালুককানুপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল করিম (৪৫) এবং শালমারা ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাবেক সভাপতি সারোয়ার হোসেন ব্যাপারী (৫৫)। গোবিন্দগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ শেষে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে এ অভিযান অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
দেশব্যাপী পরিচালিত ‘ডেভিল হান্ট’ অভিযানটি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ নিরাপত্তা কৌশল হিসেবে আলোচনায় আসে। ২০২৫ সালের শেষ প্রান্তে ‘ফেজ–২’ শুরুর পর থেকে এই অভিযানের পরিধি আরও বিস্তৃত করা হয়, বিশেষত যেসব সংগঠনের কার্যক্রম রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে, তাদের সাংগঠনিক নেতৃত্ব ও কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে নজরদারি ও আইনি পদক্ষেপ জোরদার করা হয়। গাইবান্ধা জেলার গোবিন্দগঞ্জ উপজেলাও এই অভিযানের আওতায় অন্তর্ভুক্ত, যেখানে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক সহিংসতা, ভাঙচুর, ও আইনশৃঙ্খলা অবনতির অভিযোগে একাধিক অভিযান পরিচালিত হয়েছে।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে অভিযানের আগে গোয়েন্দা নজরদারি বৃদ্ধি করা হয়। ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিক নেতৃত্বে থাকা ব্যক্তিদের গতিবিধি, স্থানীয় প্রভাব, ও নিষিদ্ধ সংগঠনের সম্ভাব্য নেটওয়ার্ক পুনর্গঠনের আশঙ্কা বিশ্লেষণ করে অভিযান পরিকল্পনা করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ৩১ ডিসেম্বর বিকেলে দুটি টিম একযোগে পৃথক স্থানে অভিযান চালায়। এক টিম তালুককানুপুর ইউনিয়নের একটি এলাকায় অভিযান পরিচালনা করে রেজাউল করিমকে আটক করে, অন্য টিম শালমারা ইউনিয়নের আরেক স্থানে অভিযান চালিয়ে সারোয়ার হোসেন ব্যাপারীকে গ্রেপ্তার করে। অভিযানে কোনো অস্ত্র উদ্ধারের তথ্য আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়নি, তবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দাবি, গ্রেপ্তারকৃতরা নিষিদ্ধ সংগঠনের কার্যক্রম পুনরুজ্জীবনে ভূমিকা রাখার চেষ্টা করছিলেন—যা তদন্তে অধিকতর যাচাই করা হবে।
রেজাউল করিম দীর্ঘদিন তালুককানুপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক কার্যক্রমে সক্রিয় ছিলেন। স্থানীয় পর্যায়ে সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক হিসেবে বিভিন্ন কর্মসূচি, সমাবেশ, ও রাজনৈতিক প্রচারণায় তার দৃশ্যমান ভূমিকা ছিল। অপরদিকে, সারোয়ার হোসেন ব্যাপারী শালমারা ইউনিয়নে স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতৃত্বে থেকে সংগঠন পরিচালনা করেছেন। ২০১৪–২০২৩ মেয়াদে সংগঠনটির ইউনিয়ন পর্যায়ের বিভিন্ন কার্যক্রমে তার সক্রিয় অংশগ্রহণের তথ্য পুলিশের নথিতে রয়েছে। সংগঠন দুটি রাষ্ট্রীয়ভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত হওয়ার পরও তাদের বিরুদ্ধে স্থানীয় প্রভাব বিস্তার ও রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক সক্রিয় রাখার অভিযোগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারিতে ছিলেন বলে জানা গেছে।
গোবিন্দগঞ্জ থানার ওসি মোজাম্মেল হক বলেন, ‘ডেভিল হান্ট–২’ অভিযানের লক্ষ্য আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের কার্যক্রম যাতে নতুন করে অস্থিতিশীলতা তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করা। তিনি জানান, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে। আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী পরবর্তী তদন্ত ও জিজ্ঞাসাবাদের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে। এ ছাড়া, গোবিন্দগঞ্জ উপজেলায় নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্লেষণ করে ভবিষ্যতেও একই ধরনের অভিযান চলমান থাকবে।
জেলা পুলিশের দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ‘ডেভিল হান্ট–২’ কেবল গ্রেপ্তার-ভিত্তিক অভিযান নয়, এটি একটি বহুমাত্রিক নিরাপত্তা কৌশল। এর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় জনগণের নিরাপত্তা ঝুঁকি বিশ্লেষণ, সম্ভাব্য সংঘাতপ্রবণ পকেট চিহ্নিতকরণ, নিষিদ্ধ সংগঠনের নেটওয়ার্ক ম্যাপিং, ডিজিটাল নজরদারি, এবং দ্রুত প্রতিক্রিয়া টিমের সক্ষমতা বৃদ্ধি। পুলিশ মনে করছে, উপজেলা পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারকারী ব্যক্তিদের কার্যক্রম নিষিদ্ধ ঘোষণার পরও তাদের প্রভাব কমে যায়নি; ফলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় কাঠামোগত নিরাপত্তা ব্যবস্থার পাশাপাশি লক্ষ্যভিত্তিক অভিযান পরিচালনা জরুরি হয়ে উঠেছে।
গোবিন্দগঞ্জ উপজেলা ভৌগোলিক ও কৌশলগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি রংপুর বিভাগের সঙ্গে সংযুক্ত যোগাযোগ রুটে অবস্থিত এবং এখানে রয়েছে একাধিক বাজার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ও শিল্পাঞ্চল-সংলগ্ন জনবসতি। রাজনৈতিক অস্থিরতা বা সহিংসতার প্রভাব এই এলাকাগুলোর অর্থনৈতিক ও সামাজিক কার্যক্রমে সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। অতীতে বিভিন্ন নির্বাচনী সহিংসতা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ, ও সড়ক অবরোধের ঘটনায় এ উপজেলার নাম উঠে এসেছে। এ কারণে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ অভিযানের মাধ্যমে নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর নেতৃত্ব ও কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে ‘জিরো টলারেন্স’ পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কৌশল গ্রহণ করেছে।
মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট আইন ও বাংলাদেশের ফৌজদারি বিচারব্যবস্থার মানদণ্ড অনুসারে, নিষিদ্ধ ঘোষিত সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত থাকা বা তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় সম্পৃক্ততা তদন্তসাপেক্ষে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তবে কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত তাকে আইনের দৃষ্টিতে নির্দোষ গণ্য করার সাংবিধানিক নীতিও সমানভাবে প্রযোজ্য। পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেপ্তারকৃতদের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো তদন্তে প্রমাণিত হলে আদালতের মাধ্যমে পরবর্তী আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
স্থানীয় পর্যায়ে অভিযানের প্রভাব নিয়ে আলোচনা রয়েছে। একদিকে প্রশাসন মনে করছে, এসব অভিযান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখতে সহায়ক; অন্যদিকে, স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে এই গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে মিশ্র প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়েছে। তবে পুলিশের অবস্থান স্পষ্ট—আইনের শাসন ও জননিরাপত্তাই এ অভিযানের প্রধান উদ্দেশ্য।
পুলিশ আরও জানিয়েছে, অভিযানের অংশ হিসেবে গোবিন্দগঞ্জে নিয়মিত টহল, ইউনিয়ন পর্যায়ে বিট-পুলিশিং কার্যক্রম জোরদার, গুরুত্বপূর্ণ স্থানে চেকপোস্ট স্থাপন, এবং সন্দেহভাজন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণে অতিরিক্ত ফোর্স মোতায়েন রাখা হয়েছে। এছাড়া, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচারণা বা নিষিদ্ধ সংগঠনগুলোর নামে নতুন করে কোনো কার্যক্রম পরিচালনার চেষ্টা হলে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায়ও ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানানো হয়েছে।
২০২৬ সালের জানুয়ারির আগেই প্রশিক্ষণ, মনিটরিং, ও অভিযানের সমন্বয়ে ‘ডেভিল হান্ট–২’ এর কার্যক্রম আরও সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে। গোবিন্দগঞ্জে রাজনৈতিক পরিচয়ের ঊর্ধ্বে উঠে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা ও জনজীবনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই এ অভিযানের মূল লক্ষ্য—এমনটাই জানিয়েছেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা।