আন্তর্জাতিক ডেস্ক
দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে টানা ভারী বর্ষণের ফলে সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় শতাধিক মানুষের মৃত্যু হয়েছে। দক্ষিণ আফ্রিকা, মোজাম্বিক ও জিম্বাবুয়েতে নদী উপচে পড়া এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কারণে বহু এলাকার যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি এবং নতুন করে বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
দক্ষিণ আফ্রিকায় বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে লিম্পোপো ও এমপুমালাঙ্গা প্রদেশ। সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, এই দুই প্রদেশে এখন পর্যন্ত অন্তত ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। প্রবল স্রোতের কারণে বহু ঘরবাড়ি পানিতে তলিয়ে গেছে এবং অনেক মানুষ বাড়ির ছাদ বা গাছে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। দুর্গতদের উদ্ধারে সেনাবাহিনীর হেলিকপ্টার মোতায়েন করা হয়েছে। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী কয়েকটি এলাকায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে, কারণ বন্যার পানি গুরুত্বপূর্ণ চেকপোস্ট ও সড়ক অবরুদ্ধ করে ফেলেছে।
দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসা বন্যাকবলিত লিম্পোপো প্রদেশ পরিদর্শন করে জানান, এক সপ্তাহেরও কম সময়ের মধ্যে সেখানে প্রায় ৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা স্বাভাবিক মৌসুমি গড়ের তুলনায় অনেক বেশি। তিনি বলেন, একটি জেলায় অন্তত ৩৬টি বসতবাড়ি সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে। লিম্পোপো প্রদেশের প্রিমিয়ার ফোফি রামাথুবা জানিয়েছেন, প্রদেশজুড়ে এক হাজারের বেশি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং বহু পরিবার আশ্রয়হীন হয়ে পড়েছে। জরুরি ত্রাণ ও পুনর্বাসন কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
প্রতিবেশী দেশ জিম্বাবুয়েতেও বন্যার প্রভাব ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে সেখানে বন্যায় অন্তত ৭০ জনের মৃত্যু হয়েছে। হাজারের বেশি বাড়ি সম্পূর্ণ বা আংশিকভাবে ধ্বংস হয়েছে। পাশাপাশি বহু স্কুল, সড়ক ও সেতু পানির তোড়ে ভেঙে পড়েছে, যা শিক্ষা কার্যক্রম ও অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থাকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করেছে। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সরবরাহও বন্ধ রয়েছে।
সবচেয়ে গুরুতর পরিস্থিতির মুখে পড়েছে মোজাম্বিক। দেশটির দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, গত বছরের শেষ দিক থেকে শুরু হওয়া অস্বাভাবিক তীব্র বর্ষা মৌসুমে সেখানে ১০৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। এসব মৃত্যুর মধ্যে বন্যায় ডুবে যাওয়া, বজ্রপাতে নিহত হওয়া, অবকাঠামো ধস এবং দূষিত পানির কারণে ছড়িয়ে পড়া কলেরার মতো পানিবাহিত রোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর ঘটনা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। কর্তৃপক্ষ আশঙ্কা করছে, বর্ষণ অব্যাহত থাকলে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
আন্তর্জাতিক মানবিক সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, মোজাম্বিকে এই দুর্যোগে দুই লাখের বেশি মানুষ সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। হাজার হাজার ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বহু পরিবারকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে বন্যার পানিতে ৭০ হাজার হেক্টরের বেশি ফসলি জমি তলিয়ে গেছে। এতে দারিদ্র্যপীড়িত ও ঘূর্ণিঝড়প্রবণ দেশটিতে খাদ্যনিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
আবহাওয়া ও দুর্যোগ বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার অন্তত সাতটি দেশে বর্তমানে বন্যা পরিস্থিতি দেখা দিয়েছে বা বন্যার আশঙ্কা রয়েছে। এই পরিস্থিতির সঙ্গে লা নিনা আবহাওয়া প্রবণতার সম্পর্ক থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। লা নিনার প্রভাবে সাধারণত দক্ষিণাঞ্চলীয় আফ্রিকায় স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি বৃষ্টিপাত হয়, যা নদী ও জলাধারগুলোকে দ্রুত বিপৎসীমার ওপরে নিয়ে যায়।
এদিকে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রুগার ন্যাশনাল পার্কেও বন্যার প্রভাব পড়েছে। সেখানে প্লাবিত ক্যাম্প এলাকা থেকে প্রায় ৬০০ পর্যটক ও কর্মীকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত কোনো প্রাণহানি বা আহতের খবর পাওয়া যায়নি। তবে নদী উপচে পড়ায় পার্কের বড় অংশ যান চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে এবং পর্যটন কার্যক্রম সাময়িকভাবে সীমিত করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষ ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো জানিয়েছে, পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি সহায়তা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।