রাজনীতি ডেস্ক
সাবেক অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান বলেছেন, কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীরই একটি রাজনৈতিক আদর্শকে ‘হত্যা’ করার অধিকার নেই এবং আদর্শিক রাজনীতির বিকল্প নেই। তিনি বলেন, রাজনৈতিক মতাদর্শ দমন করে বা নিষিদ্ধ করে গণতান্ত্রিক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। সম্প্রতি অনুষ্ঠিত একটি অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখতে গিয়ে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান জানান, ২০২৪ সালের আগস্টের পর আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করার দাবিতে জামায়াতে ইসলামের পক্ষ থেকে হাইকোর্টে একটি পিটিশন দায়ের করা হয়েছিল। ওই পিটিশনের মাধ্যমে আওয়ামী লীগকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করার আবেদন জানানো হয়। তবে সে সময় তিনি এই পিটিশনের বিরোধিতা করেন এবং আদালতে দাঁড়িয়ে বলেন, যারা এ ধরনের আবেদন করেছেন, তাদের কোনো রাজনৈতিক আদর্শকে নিশ্চিহ্ন করার অধিকার নেই।
সাবেক এই অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, তিনি দায়িত্বে থাকাকালে স্পষ্টভাবে আদালতে অবস্থান নিয়ে জানিয়েছিলেন যে, রাজনৈতিক দল বা আদর্শ নিষিদ্ধ করার বিষয়টি গণতান্ত্রিক চর্চার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তিনি বলেন, রাষ্ট্রের আইনি কাঠামোর মধ্যে থেকে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়া উচিত এবং মতাদর্শিক রাজনীতিকে দমন করা হলে তা দীর্ঘমেয়াদে রাষ্ট্র ও সমাজের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে।
আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এই দলে যেমন অপরাধে জড়িত ব্যক্তি রয়েছে, তেমনি অনেক আদর্শিক কর্মী ও রাজনৈতিক সৈনিকও রয়েছে, যারা দীর্ঘদিন ধরে দলটির রাজনৈতিক দর্শন অনুসরণ করে রাজনীতি করে আসছেন। কোনো দলের ভেতরে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড থাকলে তার বিচার আইন অনুযায়ী হওয়া উচিত, কিন্তু সে কারণে পুরো দল বা আদর্শকে নিষিদ্ধ করা ন্যায়সংগত নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আরও বলেন, হাইকোর্টে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন বাতিলের উদ্যোগ নেওয়া হলে তিনি সেখানে আইনি বাধা দেন। কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন, রাজনীতিতে আদর্শের গুরুত্ব অপরিসীম এবং আদর্শকে ধ্বংস করে কোনো টেকসই রাজনৈতিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে মতপার্থক্য থাকবে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকবে, কিন্তু সেই প্রতিদ্বন্দ্বিতা আদর্শিক ও গণতান্ত্রিক কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকা উচিত।
তিনি বলেন, একটি রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত কেবল আইনি বিষয় নয়, এটি সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবেও গভীর প্রভাব ফেলে। এ ধরনের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যতে রাজনৈতিক সহনশীলতা ও বহুদলীয় ব্যবস্থার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। ফলে আদালত ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর এ বিষয়ে অত্যন্ত সতর্ক থাকা প্রয়োজন।
বক্তব্যে তিনি আরও বলেন, রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সহনশীলতা ও আদর্শিক বিতর্কের জায়গা তৈরি করা জরুরি। মতভিন্নতা থাকলেও তা আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করা উচিত, নিষেধাজ্ঞা বা দমনমূলক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে নয়। তিনি মনে করেন, আদর্শিক রাজনীতির চর্চা জোরদার হলে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলো আরও শক্তিশালী হবে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত আলোচকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, দেশের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে রাজনৈতিক দলগুলোর আদর্শিক অবস্থান, আইন মেনে চলা এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ রক্ষার ওপর। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে নির্মূল করার মানসিকতা পরিহার করে আইনের শাসন ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা জরুরি বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
তার বক্তব্যে রাজনৈতিক দল নিবন্ধন, আদর্শিক রাজনীতি এবং আদালতের ভূমিকা নিয়ে নতুন করে আলোচনা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি দেশের বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দলীয় রাজনীতি ও আইনি কাঠামোর পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্ব বহন করছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।