আইন আদালত ডেস্ক
ঢাকা, ৬ জানুয়ারি ২০২৬—চব্বিশের জুলাই–আগস্টে ছাত্র–জনতার গণঅভ্যুত্থান চলাকালে কারফিউ জারি, আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী বল প্রয়োগে উস্কানি প্রদান এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাবেক উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান ও সাবেক আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন (চার্জ ফ্রেমিং) বিষয়ে আদেশের জন্য আগামী ১২ জানুয়ারি দিন ধার্য করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১।
প্রসিকিউশনের অভিযোগ গঠন চেয়ে করা আবেদন এবং আসামিপক্ষের অব্যাহতি চেয়ে দাখিল করা পৃথক আবেদনের ওপর উভয়পক্ষের যুক্তিতর্ক ও শুনানি শেষে বিচারপতি মো. গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের ট্রাইব্যুনাল–১ মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) আদেশের দিন নির্ধারণ করেন। শুনানি চলাকালে আসামিদের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন আইনজীবী মনসুরুল হক চৌধুরী এবং প্রসিকিউশনের পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম।
মামলার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় গত ৪ ডিসেম্বর সালমান এফ রহমান ও আনিসুল হকের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল–১–এ আনুষ্ঠানিক অভিযোগ (ফরমাল চার্জ) দাখিল করে প্রসিকিউশন। ওই অভিযোগ আমলে নিয়ে ট্রাইব্যুনাল আসামিদের বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া শুরু করেন। এর আগে ১৩ আগস্ট ২০২৫–এ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযানে গ্রেফতার হওয়ার পর থেকে দুই আসামিই কারাগারে রয়েছেন।
প্রসিকিউশনের নথি ও শুনানিতে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, গণঅভ্যুত্থান চলাকালে দুই আসামির মধ্যে একাধিক ফোনালাপ হয়, যেখানে কারফিউ পরিস্থিতিতে আন্দোলনকারীদের ‘শেষ করে দিতে হবে’—এমন বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে বলে দাবি করা হয়। প্রসিকিউশন বলছে, ওই বক্তব্য সরাসরি উস্কানি হিসেবে কাজ করে এবং এর পরপরই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে আন্দোলনরত ছাত্র–জনতার ওপর নির্বিচার গুলিবর্ষণের ঘটনা বৃদ্ধি পায়, যাতে বহু প্রাণহানি ঘটে। প্রসিকিউশনের বক্তব্যে আরও বলা হয়, আসামিদের ওই যোগাযোগ ও বক্তব্য আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় বাহিনীর কঠোর অভিযানে প্রভাব ফেলেছে, যা মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রেক্ষাপটে ‘ইনসাইটমেন্ট টু কিলিং’ বা হত্যায় প্ররোচনা হিসেবে বিবেচিত হওয়ার মতো উপাদান বহন করে।
মামলাটি আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩–এর অধীনে পরিচালিত হচ্ছে, যা যুদ্ধাপরাধ, গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ এবং শান্তিবিরোধী অপরাধ–সংক্রান্ত বিচারিক কাঠামোর মূল আইন। বাংলাদেশে ২০১০ সালে এই আইনের অধীনে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল পুনর্গঠন করা হয়, যার মাধ্যমে ১৯৭১–এর মুক্তিযুদ্ধকালীন মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার শুরু হয়। তবে বর্তমান মামলাটি মুক্তিযুদ্ধকালীন অপরাধ–সংক্রান্ত না হলেও, আইনটির আওতায় মানবতাবিরোধী অপরাধের সংজ্ঞা, দায় নির্ধারণ, কমান্ড রেসপনসিবিলিটি, প্ররোচনা, ষড়যন্ত্র, পরিকল্পনা এবং সহায়তার অভিযোগ বিচারিক পরীক্ষায় অন্তর্ভুক্ত করার বিধান রয়েছে।
জুলাই–আগস্টের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে অন্যতম তাৎপর্যপূর্ণ অধ্যায়, যেখানে শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে শুরু হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে জনসম্পৃক্ত গণআন্দোলনে রূপ নেয় এবং দেশের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা কাঠামোয় বড় ধরনের পরিবর্তন সূচিত করে। আন্দোলন চলাকালে কারফিউ জারি, মোবাইল ইন্টারনেট ও যোগাযোগব্যবস্থায় বিধিনিষেধ, নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযানে প্রাণহানি, গণগ্রেফতার এবং বল প্রয়োগ–সংক্রান্ত নানা অভিযোগ দেশজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
মানবাধিকার–সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচারে আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে ‘ইনসাইটমেন্ট’, ‘কমপ্লিসিটি’, ‘জয়েন্ট ক্রিমিনাল এন্টারপ্রাইজ’ এবং ‘কমান্ড রেসপনসিবিলিটি’—এসব ধারণা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। প্রসিকিউশনের দাবি, আন্দোলন দমনে পরিকল্পিত সহিংসতার পেছনে আসামিদের বক্তব্য ও যোগাযোগ কাঠামোগত প্ররোচনার উপাদান তৈরি করেছে, যা প্রাণঘাতী অভিযানের নৈতিক ও কার্যকারণ–সংক্রান্ত দায় নির্ধারণে বিচারিক পরীক্ষার মুখোমুখি হবে।
অপরদিকে, আসামিপক্ষ শুনানিতে অভিযোগ অস্বীকার করে অব্যাহতি চেয়ে আবেদন করেন। তাদের যুক্তিতে বলা হয়, প্রসিকিউশনের উপস্থাপিত তথ্য ও সাক্ষ্য অভিযোগ গঠনের জন্য পর্যাপ্ত আইনি উপাদান ধারণ করে না এবং ফোনালাপ–সংক্রান্ত যে বক্তব্যের উল্লেখ করা হয়েছে, তা প্রেক্ষাপট–বিচ্ছিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। আসামিপক্ষ আরও বলেন, বক্তব্যের সঙ্গে নির্দিষ্ট কোনো বাহিনীর নির্দেশনা প্রদান বা সরাসরি কমান্ড কাঠামোয় সম্পৃক্ততার স্পষ্ট প্রমাণ প্রসিকিউশন উপস্থাপন করতে পারেনি।
ট্রাইব্যুনালের আদেশের দিন নির্ধারণের অর্থ হলো, উভয়পক্ষের আবেদনের ওপর বিচারিক যুক্তিতর্ক সমাপ্ত হয়েছে এবং এখন ট্রাইব্যুনাল সিদ্ধান্ত দেবেন—আসামিদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন করে পূর্ণাঙ্গ বিচার শুরু হবে, নাকি অভিযোগ গঠনের আগেই মামলাটি খারিজ বা আসামিদের অব্যাহতি দেওয়া হবে। অভিযোগ গঠন করা হলে, মামলাটি সাক্ষ্য গ্রহণ, জেরা, তথ্য–প্রমাণ উপস্থাপন, আইনি ব্যাখ্যা ও বিচারিক বিশ্লেষণের মধ্য দিয়ে এগোবে এবং মানবতাবিরোধী অপরাধ–সংক্রান্ত দায় নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করবে।
মামলার পরবর্তী ধাপে আদেশ ঘোষণার দিন ১২ জানুয়ারি নির্ধারিত থাকায়, ওইদিন ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ–সংক্রান্ত প্রাথমিক আইনি উপাদানের মূল্যায়ন এবং বিচার শুরুর সম্ভাব্য দিকনির্দেশ স্পষ্ট হবে। আইন আদালত–সংশ্লিষ্ট পর্যবেক্ষকরা মনে করছেন, এটি বাংলাদেশের সাম্প্রতিক গণআন্দোলন–কেন্দ্রিক সহিংসতা ও মানবাধিকার–সংশ্লিষ্ট অপরাধের বিচারিক পরীক্ষার ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ মামলা, যার মাধ্যমে প্ররোচনা ও রাষ্ট্রীয় অভিযানে দায় নির্ধারণের বিষয়গুলো বিচারিক কাঠামোয় আনুষ্ঠানিকভাবে পর্যালোচিত হবে।