আইন আদালত ডেস্ক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রিটার্নিং কর্মকর্তাদের মনোনয়নপত্র বৈধতা প্রদান ও বাতিলাদেশের বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) আপিল কার্যক্রম দ্বিতীয় দিনেও অব্যাহত রয়েছে। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সকাল ১০টা থেকে রাজধানীর আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন ভবনের আপিল দায়ের কেন্দ্রে অঞ্চলভিত্তিক ১০টি বুথে আপিল আবেদন গ্রহণ শুরু হয়। ইসির কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দুপুর পৌনে ১টা পর্যন্ত দুই দিনে মোট ৭২টি আপিল আবেদন জমা পড়েছে।
এর আগে সোমবার (৫ জানুয়ারি) প্রথম দিনে মনোনয়ন বাতিলাদেশের বিরুদ্ধে ৪১টি এবং মনোনয়নপত্র গ্রহণাদেশের বিরুদ্ধে ১টি আপিল দায়ের করা হয়। একই দিনে বিভিন্ন অঞ্চলের জেলা পর্যায় থেকেও আপিল আবেদন জমা হয়। এর মধ্যে খুলনা অঞ্চল থেকে ৩টি, রাজশাহী থেকে ৫টি, রংপুর থেকে ৩টি, চট্টগ্রাম থেকে ২টি, কুমিল্লা থেকে ৫টি, ঢাকা অঞ্চল থেকে ১৫টি, ময়মনসিংহ থেকে ১টি, বরিশাল থেকে ১টি এবং ফরিদপুর অঞ্চল থেকে ৭টি আপিল আবেদন জমা পড়ে। কুমিল্লা অঞ্চল থেকে মনোনয়নপত্র গ্রহণাদেশের বিরুদ্ধে ১টি আপিল দায়ের করা হয়, যা ছিল একমাত্র গ্রহণাদেশবিরোধী আপিল।
নির্বাচনী মনোনয়নপত্র বাছাই কার্যক্রমের প্রেক্ষাপটে গত ৪ জানুয়ারি রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তারা ৩০০ সংসদীয় আসনে জমাকৃত মোট ২ হাজার ৫৬৮টি মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করেন। যাচাই শেষে ১ হাজার ৮৪২ জন প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয় এবং ৭২৩ জন প্রার্থীর প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। বাছাই কার্যক্রমে বাতিল ঘোষণার প্রধান কারণ হিসেবে ইসির কর্মকর্তারা তথ্য ঘাটতি, অসম্পূর্ণ নথি, নির্ধারিত শর্ত পূরণে ব্যর্থতা, আয়কর ও ঋণ সংক্রান্ত তথ্য অসামঞ্জস্য, প্রস্তাবক–সমর্থকের তথ্য মিল না থাকা, হলফনামায় ভুল বা স্বাক্ষর জটিলতা, প্রার্থীর নাগরিকত্ব বা পেশাগত যোগ্যতা–সংক্রান্ত তথ্য যথাযথভাবে উপস্থাপন না করা, এবং আর্থিক দায়–সংক্রান্ত কাগজপত্রে অসংগতি চিহ্নিত হওয়ার বিষয়গুলো উল্লেখ করেছেন।
মনোনয়নপত্র বৈধতা ও বাতিলাদেশবিরোধী আপিল কার্যক্রম পরিচালনার বিষয়ে ইসি আগেই একটি আনুষ্ঠানিক নোটিশ জারি করে। নোটিশ অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তার আদেশে সংক্ষুব্ধ প্রার্থী, ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান, সরকারি সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান কিংবা প্রার্থী কর্তৃক লিখিতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত ব্যক্তি মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পরবর্তী পাঁচ দিনের মধ্যে ইসিতে মেমোরেন্ডাম আকারে আপিল দায়ের করতে পারবেন। আপিল আবেদনের সঙ্গে ১ সেট মূল কাগজপত্র এবং ৬ সেট ছায়ালিপি জমা দেওয়ার বিধান রয়েছে। আবেদন গ্রহণের সময়সীমা ৫ জানুয়ারি থেকে ৯ জানুয়ারি বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্ধারণ করা হয়েছে।
আপিল দায়েরের জন্য আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন ভবনের সামনে একটি স্বতন্ত্র কেন্দ্র স্থাপন করা হয়েছে। অঞ্চলভিত্তিক ১০টি বুথের মাধ্যমে আবেদন গ্রহণ কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, যাতে প্রার্থীরা নিজ নিজ বিভাগের ভিত্তিতে আবেদন জমা দিতে পারেন। বুথগুলোতে প্রয়োজনীয় সহায়তার জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ও সহায়ক কর্মীরা কাজ করছেন। আবেদন গ্রহণের ক্ষেত্রে কোনো বাড়তি ফি নির্ধারণ করা হয়নি, তবে আবেদনপত্র যথাযথ ফরম্যাটে জমা দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
ইসিতে জমাকৃত আপিল আবেদনগুলোর শুনানি আগামী ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারির মধ্যে কমিশন ভবনের বেইজমেন্ট–২ স্তরের অডিটোরিয়ামে অনুষ্ঠিত হবে। ইসি সূত্রে জানা গেছে, পূর্ণ কমিশন (ফুল কমিশন) এসব আপিল শুনানি গ্রহণ করবেন এবং শুনানি শেষে আপিলের ওপর সিদ্ধান্ত প্রদান করবেন। শুনানির জন্য একটি সুনির্দিষ্ট সূচিও প্রকাশ করেছে কমিশন।
সূচি অনুযায়ী, ১০ জানুয়ারি সকাল ১০টা থেকে ১ থেকে ৭০ নম্বর আপিলের শুনানি হবে। ১১ জানুয়ারি ৭০ থেকে ১৪০ নম্বর, ১২ জানুয়ারি ১৪১ থেকে ২১০ নম্বর, ১৩ জানুয়ারি ২১১ থেকে ২৮০ নম্বর, ১৪ জানুয়ারি ২৮১ থেকে ৩৫০ নম্বর, ১৫ জানুয়ারি ৩৫১ থেকে ৪২০ নম্বর, ১৬ জানুয়ারি ৪২১ থেকে ৪৯০ নম্বর, ১৭ জানুয়ারি ৪৯১ থেকে ৫৬০ নম্বর এবং ১৮ জানুয়ারি ৫৬১ থেকে অবশিষ্ট আপিল আবেদনগুলোর শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিদিনের শুনানি শেষে আপিলের সিদ্ধান্ত পরবর্তী ধাপে প্রকাশ ও বিতরণের প্রক্রিয়া শুরু হবে।
আপিল নিষ্পত্তির পর ফলাফল প্রদর্শনের ক্ষেত্রে একাধিক মাধ্যমে প্রকাশের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। আপিলের ফলাফল অডিটোরিয়ামের মনিটরে প্রদর্শন করা হবে। পাশাপাশি রায়ের পিডিএফ কপি, আপিলের সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র রিটার্নিং কর্মকর্তা ও সংক্ষুব্ধ পক্ষগুলোর ই–মেইল অ্যাকাউন্টে পাঠানো হবে। একইসঙ্গে আপিলের সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনের ওয়েবসাইটেও প্রকাশ করা হবে।
শুনানি পরবর্তী রায়ের অনুলিপি বিতরণের জন্যও ইসি একটি পৃথক সূচি ঘোষণা করেছে। ১০, ১১ ও ১২ জানুয়ারির রায়ের অনুলিপি ১২ জানুয়ারি বিতরণ করা হবে। ১৩, ১৪ ও ১৫ জানুয়ারির রায়ের অনুলিপি ১৫ জানুয়ারি বিতরণ করা হবে এবং ১৬, ১৭ ও ১৮ জানুয়ারির রায়ের অনুলিপি ১৮ জানুয়ারি বিতরণ করা হবে। এসব অনুলিপি নির্বাচন কমিশন ভবনের অভ্যর্থনা কেন্দ্র থেকে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার মাধ্যমে সরবরাহ করা হবে।
নির্বাচনী আপিল কার্যক্রম বাংলাদেশের নির্বাচনী আইন ও সাংবিধানিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচিত হয়। মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের পর সংক্ষুব্ধ প্রার্থীদের জন্য আপিল প্রক্রিয়া একটি আইনি সুরক্ষা, যেখানে যাচাই–বাছাই কার্যক্রমে সম্ভাব্য প্রশাসনিক বা নথিগত ভুল সংশোধনের সুযোগ সৃষ্টি হয়। ইসি কর্তৃক এসব আপিল শুনানি পরিচালনার ফলে নির্বাচনী প্রতিযোগিতায় আইনি সমতা নিশ্চিত করা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের জবাবদিহি বজায় রাখা এবং প্রার্থীদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষার প্রক্রিয়া শক্তিশালী হয়।
আপিল কার্যক্রম চলাকালে ইসি ভবনের সামনে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার রাখা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রবেশ ও বহির্গমন পর্যবেক্ষণ করছে এবং আপিল কেন্দ্রে শৃঙ্খলা রক্ষায় নিয়োজিত রয়েছে। মনোনয়নপত্র বৈধতা–সংক্রান্ত আপিল নিষ্পত্তি শেষ হলে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশের প্রক্রিয়া শুরু হবে, যা নির্বাচনী প্রচার, প্রতীক বরাদ্দ এবং আনুষ্ঠানিক প্রচারণার ধাপ নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
ইসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে আপিল আবেদন জমা দেওয়ার প্রবণতা আরও বৃদ্ধি পেতে পারে এবং শেষ দিন পর্যন্ত বুথগুলোতে আবেদন গ্রহণ অব্যাহত থাকবে। আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তি কার্যক্রম সম্পন্ন হওয়ার পর বৈধ প্রার্থীদের নিয়ে নির্বাচন পরিচালনার পরবর্তী ধাপ শুরু করবে কমিশন।