নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকা, ৮ জানুয়ারি ২০২৬: আগের মতো কোনো পূর্বনির্ধারিত বা প্রভাবিত নির্বাচন আয়োজনের সুযোগ নেই বলে স্পষ্ট মন্তব্য করেছেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। বৃহস্পতিবার সকালে নির্বাচন কমিশন (ইসি) সচিবালয় প্রাঙ্গণে মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল আবেদনের বুথ পরিদর্শন শেষে তিনি জানান, কমিশন সাংবিধানিক কাঠামোর আওতায় সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ থেকে নির্বাচন পরিচালনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ এবং সব আবেদন আইনি ভিত্তিতে নিষ্পত্তি করা হবে।
সিইসির বক্তব্যের মূল বার্তা ছিল— নির্বাচন কমিশন ন্যায়, সমতা ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রার্থী যাচাই, আপিল নিষ্পত্তি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবে। তিনি বলেন, কমিশন ‘ইনসাফ’ তথা ন্যায়বিচারের নীতিতে বিশ্বাসী এবং মনোনয়ন সংক্রান্ত প্রতিটি আপিল আবেদন প্রযোজ্য আইন, নির্বাচন বিধিমালা ও সাংবিধানিক নির্দেশনার আলোকে সমাধান করা হবে। আপিল নিষ্পত্তিতে স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ নিশ্চিতকরণ এবং প্রার্থীদের জন্য সমতল প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র (লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড) বজায় রাখার কথাও তিনি পুনর্ব্যক্ত করেন।
ইসি সূত্র জানায়, মনোনয়নপত্র গ্রহণ ও বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আপিল আবেদন কার্যক্রম ৭ জানুয়ারি শুরু হয়েছে এবং ৮ জানুয়ারি পর্যন্ত মোট ১৮টি আবেদন জমা পড়েছে। আপিল গ্রহণ কার্যক্রম শেষ হবে ৯ জানুয়ারি শুক্রবার। পরবর্তী ধাপে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত আপিল শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। নির্বাচন কমিশন আপিল নিষ্পত্তি শেষে বৈধ প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করবে, যা ভোটের প্রতিদ্বন্দ্বিতার আনুষ্ঠানিক কাঠামো নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
আপিল আবেদন গ্রহণ বুথ পরিদর্শনের সময় সিইসি জানান, যেসব প্রার্থী বা তাদের প্রতিনিধিরা আপিল করছেন, তাদের আবেদন আইনি ভিত্তি, প্রমাণপত্র, ব্যাংকিং তথ্য, আয়কর সংক্রান্ত নথি, ফৌজদারি মামলার স্থিতি, নাগরিকত্ব তথ্য এবং নির্বাচন আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকলে সেগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ যাচাই করা হবে। আবেদন নিষ্পত্তিতে কোনো বৈষম্য, পক্ষপাত বা রাজনৈতিক বিবেচনা স্থান পাবে না বলেও তিনি জোর দিয়ে বলেন।
নির্বাচন কমিশনের আপিল প্রক্রিয়া বাংলাদেশের নির্বাচনী আইনি কাঠামোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ। গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২ সালের সংবিধান এবং নির্বাচন কমিশন পরিচালিত বিধিমালার আওতায় মনোনয়ন যাচাই ও আপিল নিষ্পত্তি পরিচালিত হয়। আরপিও অনুসারে, কমিশনের মনোনয়নপত্র বাতিল বা গ্রহণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সংক্ষুব্ধ পক্ষ নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিল করতে পারে এবং শুনানি শেষে কমিশন চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়, যা উচ্চ আদালতে চ্যালেঞ্জ করা না হলে কার্যকর থাকে।
বিশ্লেষকদের মতে, সিইসির বক্তব্য এমন এক সময়ে এসেছে, যখন মনোনয়ন পর্যায়ে প্রার্থী যাচাই, আর্থিক স্বচ্ছতা, খেলাপি ঋণ, মামলা-সংক্রান্ত জটিলতা, নাগরিকত্ব বিতর্ক, প্রার্থী বাছাইয়ে নৈতিক মানদণ্ড এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় প্রশাসনিক সমন্বয় নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে ধারাবাহিক আলোচনা চলছে। বিশেষত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণ, রাজনৈতিক হত্যা, সীমান্ত নজরদারি ও গোয়েন্দা সক্ষমতা, এবং নির্বাচনকেন্দ্রিক নাগরিক আস্থার প্রশ্নগুলো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে গুরুত্ব পেয়েছে।
ইসি কর্মকর্তারা জানান, আপিল বুথে আবেদনকারীদের উপস্থিতি প্রত্যাশার তুলনায় বেশি। সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন জেলা, উপজেলা ও বিভাগ থেকে প্রার্থীরা ইসি প্রাঙ্গণে উপস্থিত হচ্ছেন। আপিল গ্রহণের জন্য ইসির নির্ধারিত বুথগুলোতে আলাদা সারি, টোকেন ব্যবস্থা, নথি জমা যাচাই, প্রাথমিক রিসিভিং স্লিপ প্রদান এবং ডিজিটাল এন্ট্রি সিস্টেম ব্যবহার করা হচ্ছে, যাতে প্রতিটি আবেদন সঠিকভাবে রেকর্ডভুক্ত থাকে। কমিশন জানিয়েছে, মনোনয়ন যাচাইয়ে প্রযুক্তিগত সহায়তা, ডেটাবেইজ মিলিয়ে দেখা, এবং প্রার্থী সংক্রান্ত বিভিন্ন সংস্থার তথ্য সমন্বয়ের মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো শক্তিশালী করা হয়েছে।
আপিল শুনানির সময়সূচি ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি পর্যন্ত নির্ধারিত হলেও কমিশন জানিয়েছে, শুনানির ক্ষেত্রে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সংখ্যক আবেদন নিষ্পত্তির পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, যাতে দীর্ঘসূত্রতা এড়ানো সম্ভব হয়। শুনানি চলাকালে প্রার্থী, তার আইনজীবী বা মনোনীত প্রতিনিধিকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে এবং প্রযোজ্য প্রমাণপত্র দাখিল সাপেক্ষে সিদ্ধান্ত জানিয়ে দেওয়া হবে।
বাংলাদেশে নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় আপিল নিষ্পত্তি একটি স্পর্শকাতর কিন্তু নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। মনোনয়ন বাতিলের কারণ সাধারণত আয়কর খেলাপ, ব্যাংক ঋণ খেলাপ, দ্বৈত নাগরিকত্ব সংক্রান্ত অস্পষ্টতা, গুরুতর ফৌজদারি মামলায় দণ্ডপ্রাপ্তি, অথবা আরপিও ও আচরণবিধির বিধান লঙ্ঘনের অভিযোগের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে কমিশন আপিল শুনানি শেষে প্রযোজ্য প্রমাণ ও আইনগত ব্যাখ্যার ভিত্তিতে বাতিলের সিদ্ধান্ত বহাল রাখতে পারে অথবা প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করতে পারে।
সিইসি এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, “যারা আবেদন করছেন, তাদের প্রতিটি আবেদন আইনের ভিত্তিতে সমাধান করা হবে। নির্বাচন কমিশন স্বচ্ছতায় বিশ্বাসী, প্রার্থীদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করবে এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় কোনো অনিয়ম, বৈষম্য বা প্রভাব বিস্তারের সুযোগ রাখা হবে না।”
নির্বাচন কমিশন জানিয়েছে, আপিল নিষ্পত্তি শেষে বৈধ প্রার্থীদের চূড়ান্ত তালিকা প্রকাশ করা হবে। এরপর প্রার্থীরা আনুষ্ঠানিক প্রচারণা, প্রতীক বরাদ্দ এবং নির্বাচনী আচরণবিধির আওতায় ভোটের প্রতিযোগিতায় অংশ নেবেন। এই ধাপের সফল ও স্বচ্ছ বাস্তবায়ন আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নিরপেক্ষতা, গ্রহণযোগ্যতা ও সাংবিধানিক দায়িত্ব পালনে কমিশনের সক্ষমতার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হিসেবে বিবেচিত হবে।