ক্রীড়া প্রতিবেদক
বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের (বিপিএল) চলতি আসরে ঢাকা ক্যাপিটালস হারের ধারা কাটাতে ব্যর্থ হয়েছে। ১৮১ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে সিলেট টাইটান্সের নিয়ন্ত্রিত বোলিং ও মাঠ পরিকল্পনার সামনে ২০ ওভারে ৮ উইকেট হারিয়ে ১৬০ রানে থামে ঢাকা। ফলে ২০ রানের জয় পায় সিলেট টাইটান্স। বৃহস্পতিবার (তারিখ উল্লেখ না থাকায় দিন-তারিখ অপরিবর্তিত) সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে টস হেরে আগে ব্যাট করে ৬ উইকেটে ১৮০ রান তোলে সিলেট, জবাবে ঢাকা নির্ধারিত ওভারে ১৬০ রান সংগ্রহ করে।
ম্যাচের ফলাফলে সিলেট টাইটান্স আট ম্যাচে চার জয় নিয়ে মধ্য টেবিলে অবস্থান সংহত করেছে, বিপরীতে ঢাকা ক্যাপিটালস ছয় ম্যাচে চার পরাজয়ের কারণে পয়েন্ট টেবিলে পিছিয়ে পড়েছে। বিপিএলের চলতি মৌসুমে ঢাকার পারফরম্যান্সে ধারাবাহিকতার ঘাটতি স্পষ্ট, বিশেষ করে ডেথ ওভারে বোলিং, মিডল অর্ডারের ব্যাটিং ও চাপের মুহূর্তে রান রেট নিয়ন্ত্রণে দলটি পিছিয়ে থাকছে।
আগে ব্যাট করতে নেমে সিলেটের ইনিংসের প্রথম ১৫ ওভারে স্কোরবোর্ডে ছিল ৫ উইকেটে ১০৭ রান। উইকেট পতনের পরও দলটির রান সংগ্রহ থামেনি, কারণ টপ ও লোয়ার মিডল অর্ডারে দায়িত্ব ভাগাভাগি করে এগিয়ে নেন পারভেজ ইমন (৩২), আজমতউল্লাহ ওমরজাই (৩৩) ও আরিফুল হক (৩৮)। তবে ইনিংসের মূল বাঁক তৈরি হয় ১৯তম ওভারে। ১৮ ওভার শেষে স্কোর ছিল ৫ উইকেটে ১৩৫ রান, সেখান থেকে ১৮১ রানের লক্ষ্য দাঁড় করাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন ইংলিশ অলরাউন্ডার মঈন আলি। ঢাকার বোলার নাসির হোসেনের করা ১৯তম ওভারে তিন ছক্কা ও দুই চারে মাত্র ৮ বলে ২৮ রান তোলেন মঈন। ওই ওভারে মোট ২৮ রান ওঠায় সিলেটের সংগ্রহ দ্রুত ১৬৩ রানে পৌঁছে যায়, যা প্রতিপক্ষের ওপর মানসিক চাপ তৈরি করে। শেষ ওভারে আরও ১৭ রান যোগ হলে স্কোর দাঁড়ায় ১৮০। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ১৭ থেকে ১৯ ওভারের মধ্যে এমন রান তোলার হার ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রভাবক হিসেবে বিবেচিত হয়, কারণ এ পর্যায়ে রান দ্রুত বাড়লে লক্ষ্য তাড়ায় প্রতিপক্ষের পরিকল্পনা পুনর্গঠন করতে হয়।
ঢাকার বোলিং ইনিংসে সবচেয়ে কার্যকর ছিলেন জিয়াউর রহমান। ৪ ওভারে ৩৫ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন তিনি, যা ইনিংসের মাঝ পর্যায়ে সিলেটকে কিছুটা মন্থর করতে সহায়তা করে। এছাড়া পাকিস্তানি স্পিনার ইমাদ ওয়াসিম ১ উইকেট এবং ১৯তম ওভারে রান খরচের পরও নাসির হোসেন ১ উইকেট শিকার করেন। বিপিএলের চলতি মৌসুমে ডেথ ওভারে বোলিংয়ের অর্থনীতি রেট দলগুলোর জয়-পরাজয়ে বড় প্রভাব ফেলছে। সিলেটের ক্ষেত্রে ১৯তম ওভারে ব্যাটিং সাফল্য, আর ঢাকার ক্ষেত্রে একই ওভারে রান খরচ ম্যাচে সরাসরি প্রভাব ফেলেছে।
১৮১ রানের লক্ষ্য তাড়ায় ঢাকা ক্যাপিটালসের শুরু ছিল প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ। ওপেনার রহমানুল্লাহ গুরবাজ ও আব্দুল্লাহ আল মামুন প্রথম পাওয়ারপ্লেতে (৬ ওভার) ৫০ রান তোলেন, যা বড় লক্ষ্য তাড়ায় একটি ইতিবাচক সূচনা হিসেবে ধরা হয়। ১১ বলে ২৪ রান করে মামুন ফিরলে ৫৬ রানের উদ্বোধনী জুটি ভাঙে। এরপর গুরবাজ ৫১ রান করে ইনিংসের ভিত্তি মজবুত রাখলেও মিডল অর্ডারের দ্রুত উইকেট পতনে ঢাকার রান রেট কমতে থাকে। তিন নম্বরে নেমে ৭ বলে ৩ রান করেন নাসির হোসেন, চার নম্বরে শামিম হোসেন ১ রানে ফেরেন। পরবর্তী ব্যাটারদের মধ্যে সাইফ হাসান ও সাব্বির রহমান শুরুতে স্ট্রাইক রোটেশন ধরে রাখলেও প্রয়োজনীয় ৯.০৫ রান প্রতি ওভার রেটের (১৮১/২০) তুলনায় তাদের ব্যাটিংয়ে ঝুঁকি নেওয়ার হার কম ছিল, ফলে রান গতি বাড়েনি। বিপিএলের চলতি মৌসুমে বড় লক্ষ্য তাড়ায় সফল দলগুলো সাধারণত ১২–১৬ ওভারের মধ্যে গড়ে ৯.৫–১০.৫ রানের কাছাকাছি রান রেট ধরে রাখে। ঢাকার ইনিংসে ১২ ওভার শেষে স্কোর ছিল ৩ উইকেটে ৯৮, অর্থাৎ পাওয়ারপ্লের পরও তারা ৯ রানের নিচে গড়ে খেলেছে, যা চাপ বাড়ায়। শেষ ৮ ওভারে প্রয়োজন ছিল ৮৩ রান, কিন্তু সিলেটের বোলারদের লাইন–লেন্থ, পরিবর্তিত গতি ও ফিল্ড সেটিংয়ের কারণে ৮ উইকেট হারিয়ে ৬২ রান যোগ করতে পারে ঢাকা।
সিলেট টাইটান্সের বোলিং ইনিংসে কৌশলগত সফলতার কেন্দ্রবিন্দু ছিলেন সালমান ইরশাদ ও মঈন আলি। সালমান ৪ ওভারে ২৫ রান দিয়ে ৩ উইকেট নেন, যার মধ্যে ১৪–১৮ ওভারের মধ্যবর্তী স্পেলে তিনি ঢাকার সেট ব্যাটারদের শট নির্বাচন বাধাগ্রস্ত করেন। মঈন আলি ৪ ওভারে মাত্র ২০ রান দিয়ে ২ উইকেট নেন, যা বিপিএলের চলতি মৌসুমে সেরা অলরাউন্ড স্পেলগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। সালমান ও মঈনের ৮ ওভারে ৪৫ রান খরচ ঢাকার ব্যাটিং পরিকল্পনা ভেঙে দেয় এবং লক্ষ্য তাড়ার শেষভাগে দলটিকে চাপে ফেলে। টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ম্যাচ জেতানো বোলিং জুটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিপক্ষের ওপর চাপ ধরে রেখে উইকেট নেওয়া ও রান অর্থনীতি ৬.৫–৭.৫ এর মধ্যে রাখা; সিলেটের এই জুটি ম্যাচে সেটি বাস্তবায়ন করেছে।
এই ম্যাচের প্রেক্ষাপটে ঢাকা ক্যাপিটালসের জন্য কয়েকটি কৌশলগত ইঙ্গিত স্পষ্ট হয়েছে— (১) ডেথ ওভারে বোলিংয়ের গতি পরিবর্তন ও ইয়র্কার/স্লোয়ার ডেলিভারির বৈচিত্র্য বাড়ানো, (২) মিডল অর্ডারে শট নির্বাচন ও রিস্ক–রিওয়ার্ড অনুপাত উন্নত করা, (৩) বড় লক্ষ্য তাড়ায় ১২–১৬ ওভারের মধ্যে রান রেট ৯.৫ এর ওপরে ধরে রাখার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন, (৪) স্পিনারদের ওভার বণ্টন ও ম্যাচআপ অনুযায়ী ব্যবহারে সমন্বয় আনা। বিপিএলের মতো প্রতিযোগিতামূলক ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগে যেখানে দলগুলোতে আন্তর্জাতিক মানের বোলার ও ফিনিশার থাকেন, সেখানে ১৭–১৯ ওভারে ম্যাচ–ডিফাইনিং পারফরম্যান্স অধিকাংশ ক্ষেত্রে জয় নির্ধারণ করে দেয়, যা এই ম্যাচেও দেখা গেছে।
ম্যাচ–পরবর্তী পয়েন্ট টেবিলের চিত্রে সিলেট টাইটান্স সমতা ধরে রেখেছে, তবে ঢাকা ক্যাপিটালসকে পরবর্তী ম্যাচগুলোতে নেট রান রেট ও কৌশলগত বাস্তবায়নে দ্রুত উন্নতি আনতে হবে, নতুবা প্লে–অফ দৌড়ে তাদের অবস্থান আরও নাজুক হতে পারে। বিপিএলের চলতি মৌসুমে বড় স্কোর তাড়া করে জেতা ম্যাচগুলোর পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, যে দল ডেথ ওভারে ব্যাটিংয়ে ১২.৫–১৫.০ রানের স্ট্রাইক রেট উইন্ডোতে খেলে এবং বোলিংয়ে ৮.০ এর নিচে অর্থনীতি ধরে রাখে, তারাই সাধারণত সফল হয়। সিলেট টাইটান্স ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই ডেথ ওভারের নিয়ন্ত্রণে এগিয়ে থাকায় ম্যাচ জিতে নেয়।