বাংলাদেশ ডেস্ক
মুক্ত অনলাইন বিশ্বকোষ হিসেবে পরিচিত উইকিপিডিয়া স্বেচ্ছাসেবকদের সম্মিলিতভাবে সম্পাদিত হওয়ার কথা থাকলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্ল্যাটফর্মকে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক ও রাজনৈতিক ইতিহাসের নিরপেক্ষ চিত্র প্রদর্শনে ব্যর্থ বলে অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর বাংলাদেশের শহীদ ও আন্দোলনকারীদের নামে তৈরি পেজগুলি একপেশে অপসারণের ঘটনা নজরকাড়া পর্যায়ে বৃদ্ধি পেয়েছে।
জুলাই ২০২৪ সালে বাংলাদেশে ছাত্রলীগের হামলার প্রতিবাদে শুরু হওয়া বিক্ষোভে দেশের তিন জেলায় ছয়জন নিহত হন। এই ঘটনায় দেশজুড়ে গণবিস্ফোরণ ঘটে এবং তা প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিবর্তনের সূচনা করে। শহীদদের মধ্যে চট্টগ্রামে নিহত ছাত্রদল নেতা ওয়াসিম আকরাম ও ছাত্রশিবির নেতা ফয়সাল আহমেদ শান্ত উল্লেখযোগ্য। তাঁদের নামে উইকিপিডিয়ায় পেজ তৈরি করা হয় এবং বিভিন্ন উৎস ও সূত্রের ভিত্তিতে তথ্য উপস্থাপন করা হয়।
তবে অভিযোগ উঠেছে, এই পেজগুলো ‘নি৭’ ধারা ব্যবহার করে অপ্রাসঙ্গিক হিসেবে দ্রুত অপসারণ করা হয়েছে। ধারাটি ব্যবহার করে বলা হয়—‘অগুরুত্বপূর্ণ বিষয়বস্তু বা ঘটনা’। যারা লেখাগুলি লিখেছেন, তারা দীর্ঘ কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা সম্পন্ন স্বেচ্ছাসেবক হলেও প্রশাসকের কাছ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাননি। বারবার পেজ পুনঃপ্রকাশের দাবি জানালেও কিছু লেখক বিরক্ত না হওয়ার হুঁশিয়ারি পেয়েছেন। জুলাই বিপ্লবের শহীদ ইমতিয়াজ আহমেদ জাবিরের পেজও একইভাবে অপসারণের শিকার হয়।
উল্লেখযোগ্য, শুধু শহীদ নয়, বিপ্লবের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন ও নেতাদের পেজও প্রায় একইভাবে মুছে ফেলার চেষ্টা চলছে। জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সহ অন্যান্য আন্দোলনমুখী গোষ্ঠীর পেজগুলোর ক্ষেত্রেও সংঘবদ্ধভাবে বিতর্ক তৈরি ও অপসারণের চেষ্টা লক্ষ্য করা গেছে। ডাকসু ও ছাত্রশিবিরের গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের উইকিপিডিয়া পেজ একাধিকবার মুছে ফেলা হলেও সাম্প্রতিক সময়ে পুনরায় প্রকাশ করা হয়েছে।
অপরদিকে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতাদের পেজগুলিতে প্রশংসাসূচক তথ্য থাকলেও হামলা বা হত্যাচেষ্টার ঘটনা উল্লেখ করা হয়নি। ফলে শহীদ ও ফ্যাসিবাদবিরোধী নেতাদের ইতিহাসের তথ্যগুলো প্রণোদনা ও প্রকাশে সীমাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, আপত্তি তোলার কারণে একাধিক লেখকের অ্যাকাউন্টও ব্লক করা হয়েছে।
উইকিপিডিয়ার নিয়মিত লেখকরা জানান, বাংলা উইকিপিডিয়ায় কিছু স্বেচ্ছাসেবক ও প্রশাসকের মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট আদর্শিক গোষ্ঠীর প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ভারতের সরকারের ভাবমূর্তি ও আদর্শিক মনোভাবকে সমর্থনযোগ্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার প্রচেষ্টা এবং বাংলাদেশের সাধারণ মানুষের ধর্ম ও রাজনৈতিক অবস্থানের বিপরীত লেখা সমর্থন পাচ্ছে। ফলে দেশীয় রাজনৈতিক ও সাম্প্রদায়িক ইতিহাসের নিরপেক্ষ চিত্র উপস্থাপনা ব্যাহত হচ্ছে।
জুলাই বিপ্লবের সংগঠকরা অভিযোগ করেন, ২০১৪ সালের পর থেকে বিভিন্ন তথ্যপ্রযুক্তি প্ল্যাটফর্মে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারের ধারাবাহিকতায় উইকিপিডিয়াতেও স্বার্থান্বেষী কার্যক্রম চলছে। তারা মনে করছেন, সরকারের নির্দিষ্ট উদ্যোগ ছাড়া বিষয়টি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন। তবে কিছু সংগঠক এবং ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয় বিষয়টি উইকিপিডিয়া কমিউনিটির সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পরামর্শ দিয়েছেন।
পরিস্থিতি বিশ্লেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাস ও শহীদদের তথ্যের স্বচ্ছতা বজায় রাখতে এবং অনলাইন বিশ্বকোষগুলিতে নিরপেক্ষতার নিশ্চয়তা দিতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা জরুরি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও স্বেচ্ছাসেবকদের মধ্যে সমন্বয় স্থাপন ছাড়া ইতিহাসের সঠিক চিত্র জনগণের কাছে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়বে।