অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্তের পর এবার ভারতের পণ্যের ক্ষেত্রেও একই পথে হাঁটার বিষয়টি বিবেচনা করছে বাংলাদেশ। বিশেষ করে ভারত থেকে আমদানিকৃত তুলা ও সুতার ওপর শুল্ক আরোপের সম্ভাবনা গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করছে অন্তর্বর্তী সরকার। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, এই সিদ্ধান্ত কার্যকর হলে দুই দেশের বাণিজ্যিক সম্পর্কে তাৎপর্যপূর্ণ প্রভাব পড়তে পারে।
প্রাপ্ত তথ্যমতে, গত ৫ জানুয়ারি বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের এক বৈঠকে ভারতীয় তুলা ও সুতা আমদানির ওপর সম্ভাব্য শুল্ক আরোপের বিষয়টি প্রাথমিকভাবে আলোচনা হয়। বৈঠকের আলোচ্যসূচিতে আমদানিনির্ভর কাঁচামালের ওপর শুল্ক কাঠামো পুনর্বিবেচনা এবং দেশীয় শিল্প সুরক্ষার দিকগুলো গুরুত্ব পায়। যদিও বৈঠক থেকে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত আসেনি, তবে বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সক্রিয়ভাবে বিবেচিত হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা ইঙ্গিত দিয়েছেন।
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ তুলা ও সুতা আমদানিকারক দেশ। দেশের তৈরি পোশাক ও বস্ত্রশিল্পের বড় অংশই আমদানিকৃত কাঁচামালের ওপর নির্ভরশীল। এর মধ্যে ভারত বাংলাদেশের প্রধান সরবরাহকারী দেশগুলোর একটি। প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ তুলা ও সুতা ভারত থেকে আমদানি করা হয়, যা দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পে ব্যবহৃত হয়। ফলে আমদানিতে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত শুধু দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য নয়, বরং দেশের শিল্প খাতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাজার বিশ্লেষকদের ধারণা, প্রস্তাবিত শুল্কহার ১০ থেকে ২০ শতাংশের মধ্যে হতে পারে। এই হারে শুল্ক আরোপ করা হলে ভারত থেকে আমদানিকৃত তুলা ও সুতার দাম বাড়বে, যা বিকল্প বাজার অনুসন্ধানে বাংলাদেশকে উৎসাহিত করতে পারে। একই সঙ্গে দেশীয় স্পিনিং মিল ও তুলা প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পকে কিছুটা প্রতিযোগিতামূলক সুবিধা দিতে পারে বলেও মত দেওয়া হচ্ছে।
ভারতের দৃষ্টিকোণ থেকে এই সিদ্ধান্তের প্রভাবও উল্লেখযোগ্য হতে পারে। বাংলাদেশ ভারতের তুলা ও সুতা রপ্তানির অন্যতম বড় গন্তব্য। শুল্ক আরোপের ফলে ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে তুলার চাহিদা হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এর প্রভাব দেশটির তুলা উৎপাদক কৃষক ও সুতা উৎপাদনকারী কারখানার ওপর পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, রপ্তানি কমে গেলে ভারতের বাজারে তুলার দাম ও সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি হতে পারে।
উল্লেখযোগ্য যে, এর আগে ২০২৫ সালের ১০ আগস্ট থেকে ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি নির্দিষ্ট সময়ের জন্য শুল্কমুক্ত আমদানির সুবিধা দেওয়া হয়েছিল। সে সময় ভারতের অভ্যন্তরীণ বাজারে তুলার দাম উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায়। নতুন করে শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত সেই বাজার পরিস্থিতিকে আবারও পরিবর্তনের মুখে ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে চলমান কূটনৈতিক টানাপোড়েনও এই বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের পেছনে একটি প্রেক্ষাপট হিসেবে দেখা হচ্ছে। রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর দুই দেশের সম্পর্কের মধ্যে যে শীতলতা সৃষ্টি হয়েছে, তার প্রভাব বাণিজ্যনীতিতেও প্রতিফলিত হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশ্লেষকদের মতে, শুল্ক আরোপের মতো পদক্ষেপ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা বাড়াতে পারে এবং রপ্তানি-আমদানির প্রবাহে চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
একাধিক গবেষণা প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে, বাণিজ্যিক উত্তেজনা বাড়লে বাংলাদেশের রপ্তানিও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। ভারতের বাজারে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্য পরিমাণ পণ্য রপ্তানি হয়, যার একটি বড় অংশ তৈরি পোশাক ও বস্ত্রখাতভিত্তিক। শুল্ক ও অশুল্ক বাধা বাড়লে সেই রপ্তানি প্রবাহ ব্যাহত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
সব মিলিয়ে, ভারত থেকে তুলা ও সুতা আমদানির ওপর শুল্ক আরোপের বিষয়টি এখনো সিদ্ধান্তের পর্যায়ে না পৌঁছালেও, এটি বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতি ও আঞ্চলিক অর্থনৈতিক সম্পর্কের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে সরকার শিল্পখাত, রপ্তানিকারক ও বাণিজ্য অংশীজনদের সঙ্গে আরও আলোচনা করবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।