রাজনীতি ডেস্ক
নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে স্বতন্ত্র বা ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী হওয়ার নেতাদের নিয়ন্ত্রণ ও মনোনয়ন প্রত্যাহারে রাজি করানোর জন্য দুটি কৌশল গ্রহণ করেছে। একটি হলো সংযতভাবে বোঝানো এবং পরামর্শ দেওয়া, অন্যটি হলো প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া। দলীয় উচ্চপর্যায়ের সূত্রে জানা গেছে, এই পদক্ষেপ নেওয়ার লক্ষ্য দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষা ও নির্বাচনী ঐক্য নিশ্চিত করা।
বিএনপির অঞ্চলভিত্তিক জ্যেষ্ঠ নেতাদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে স্বতন্ত্র প্রার্থীদের সঙ্গে সরাসরি আলোচনা করার জন্য। এই আলোচনায় নেতাদের বোঝানো হচ্ছে যে দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করলে সাংগঠনিকভাবে নেতাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। ইতিমধ্যে এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে কয়েকজন প্রার্থী মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারে সম্মত হয়েছেন। তবে শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, আলোচনার ধারা কার্যকর না হলে শেষ পর্যায়ে দলের চেয়ারপারসনও এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হতে পারেন।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ শুক্রবার বলেন, “প্রতিনিয়ত বোঝানো হচ্ছে। এরপরও না মানলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়াই হবে। অন্য কোনো বিকল্প নেই।” নির্বাচন কমিশনের তফসিল অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন ২০ জানুয়ারি। দলীয় সিদ্ধান্ত অনুসারে, নির্ধারিত সময়ে মনোনয়ন প্রত্যাহার করলে সংশ্লিষ্ট নেতাদের সাধুবাদ জানানো হবে, আর সময়সীমা অতিক্রম করলে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
বর্তমান নির্বাচনে বিএনপি সারা দেশের ১১৭টি আসনে ১১৯ জন নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। এর মধ্যে বেশ কিছু প্রার্থীর মনোনয়নপত্র নির্বাচন কমিশন বাতিল করেছে। দলীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, স্থানীয় নেতৃত্বের সঙ্গে দ্বন্দ্ব বা দীর্ঘদিনের পুরোনো নেতাদের বাদ পড়া বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ার প্রধান কারণ।
নির্বাচনে সমঝোতার অংশ হিসেবে বিএনপি ১৬টি আসনে যুগপৎ আন্দোলনের শরিক দলগুলোর প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে। তবে বাস্তবতায় অনেক এলাকায় স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপির স্বতন্ত্র বা বিদ্রোহী প্রার্থীদের সক্রিয়তায় জোটপ্রার্থীরা কার্যকর সহযোগিতা পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় শরিক দলগুলোর নেতারা কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের হস্তক্ষেপ চেয়েছেন, যাতে মাঠপর্যায়ে সহযোগিতা নিশ্চিত হয়।
এবারের নির্বাচনে বিএনপি বিভিন্ন আসনে শরিক দলের জন্য আসন ছাড় দিয়েছে। বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের মাহমুদুর রহমান মান্না, ভোলা-১ আসনে বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির আন্দালিভ রহমান পার্থ, নড়াইল-২ আসনে এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, যশোর-৫ আসনে জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের মুফতি রশিদ বিন ওয়াক্কাছ, পটুয়াখালী-৩ আসনে গণ অধিকার পরিষদের নুরুল হক নুর, ঝিনাইদহ-৪ আসনে রাশেদ খাঁন, ঢাকা-১২ আসনে বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাইফুল হক, ঢাকা-১৩ আসনে এনডিএমের ববি হাজ্জাজ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৬ আসনে গণসংহতি আন্দোলনের জোনায়েদ সাকি, লক্ষ্মীপুর-১ আসনে বিএলডিপির শাহাদাত হোসেন সেলিম, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে সৈয়দ এহসানুল হুদা এবং কুমিল্লা-৭ আসনে এলডিপির রেদওয়ান আহমেদকে দল ছেড়ে দিয়েছে। এঁদের মধ্যে ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, রাশেদ খাঁন, শাহাদাত হোসেন সেলিম, এহসানুল হুদা, রেদওয়ান আহমেদ ও ববি হাজ্জাজ বিএনপিতে যোগ দিয়ে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচন করছেন।
জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশকে চারটি আসন ছেড়ে দিয়েছে বিএনপি। এসব আসনে তারা দলীয় প্রতীকে (খেজুরগাছ) নির্বাচন করছেন। তৃণমূল পর্যায়ে সমঝোতা থাকা সত্ত্বেও কেন্দ্রীয়ভাবে কঠোর নির্দেশ না থাকার কারণে মাঠে বিভ্রান্তি ও দ্বিধা দেখা দিয়েছে। কিছু এলাকায় সামান্য উন্নতি হলেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা সম্পূর্ণ নয়।
বিএনপি শীর্ষ নেতৃত্ব মনে করছে, বিদ্রোহী ও স্বতন্ত্র প্রার্থীদের নিয়ন্ত্রণে আনতে পারলে ভোটের মাঠে দলীয় অবস্থান আরও শক্তিশালী হবে। ফলে দলের শৃঙ্খলা রক্ষা এবং নির্বাচনী কৌশল বাস্তবায়ন এখন প্রধান অগ্রাধিকার হিসেবে দেখা হচ্ছে।