খেলাধূলা ডেস্ক
দক্ষিণ এশিয়ায় আয়োজন হতে যাওয়া একটি বহুজাতিক আন্তর্জাতিক ক্রিকেট টুর্নামেন্টকে ঘিরে এখনো চূড়ান্ত সূচি ও ভেন্যু নির্ধারণে অনিশ্চয়তা কাটেনি। টুর্নামেন্ট শুরুর সময় ঘনিয়ে এলেও অংশগ্রহণকারী কয়েকটি দেশের মধ্যে নিরাপত্তা, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং ক্রিকেট প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে। এর ফলে আয়োজক ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেট নিয়ন্ত্রক সংস্থার সামনে বড় ধরনের সমন্বয় চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।
এই টুর্নামেন্টটি ভারত ও শ্রীলঙ্কায় যৌথভাবে আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো কোথায় অনুষ্ঠিত হবে, তা নিয়ে এখনো নিশ্চিত সিদ্ধান্ত হয়নি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) নিরাপত্তাজনিত উদ্বেগের কথা জানিয়ে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) সঙ্গে আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু করেছে। বিসিবির প্রস্তাব অনুযায়ী, বাংলাদেশের ম্যাচগুলো শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের বিষয়টি বিবেচনায় নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
বাংলাদেশের পক্ষ থেকে উত্থাপিত নিরাপত্তা উদ্বেগের পেছনে একাধিক কারণ কাজ করছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে ঢাকা ও নয়াদিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন এবং একজন বাংলাদেশি ক্রিকেটারকে ঘিরে উদ্ভূত বিতর্ক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। আইপিএলের নিলামে একটি ভারতীয় ফ্র্যাঞ্চাইজি দল ওই ক্রিকেটারকে দলে নিলেও পরবর্তী সময়ে পরিবর্তিত পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করে তাকে দল থেকে বাদ দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্ত বাংলাদেশে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং ক্রিকেট অঙ্গনে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
এর পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে আইপিএলের সম্প্রচার বন্ধের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে আইসিসির কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আবেদন জানানো হয়, যাতে আসন্ন বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচগুলো ভারত থেকে অন্য ভেন্যুতে সরিয়ে নেওয়া হয়। বিসিবির যুক্তি ছিল, একটি ঘরোয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি টুর্নামেন্টে যদি কোনো খেলোয়াড়ের নিরাপত্তা নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়, তবে আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টে পুরো দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা নিয়ে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে।
৭ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হতে যাওয়া এই বিশ্বকাপ ইতোমধ্যে ক্রীড়াঙ্গনের বাইরের বিভিন্ন বাস্তবতার প্রভাব অনুভব করছে। দক্ষিণ এশিয়ার ক্রিকেটে অতীতেও ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েনের কারণে টুর্নামেন্ট আয়োজন ও ভেন্যু নির্ধারণে পরিবর্তন এসেছে। ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক উত্তেজনার সময় একটি সমঝোতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত হয়েছিল, এক দেশে টুর্নামেন্ট হলে অপর দেশ তাদের ম্যাচ নিরপেক্ষ ভেন্যুতে খেলবে। সেই নীতির ধারাবাহিকতায় পাকিস্তান তাদের কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় আয়োজন করেছে। একইভাবে অতীতে ভারত সংযুক্ত আরব আমিরাতে ম্যাচ খেলেছে।
ভারত দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তাজনিত কারণ দেখিয়ে পাকিস্তানে দল পাঠাতে অনিচ্ছা প্রকাশ করে আসছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে বাংলাদেশও একই ধরনের যুক্তি সামনে এনে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করছে। ক্রিকেট সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এতে করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ভেন্যু নির্ধারণ ও অংশগ্রহণের প্রশ্নে সমতার বিষয়টি আবারও আলোচনায় এসেছে।
এই প্রেক্ষাপটে আইসিসির ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা হিসেবে আইসিসির দায়িত্ব হলো অংশগ্রহণকারী সব দেশের জন্য সমান নীতি প্রযোজ্য করা এবং কোনো দেশের ওপর একতরফা সিদ্ধান্ত চাপিয়ে না দেওয়া। টুর্নামেন্টের সুষ্ঠু আয়োজন নিশ্চিত করতে নিরাপত্তা মূল্যায়ন, কূটনৈতিক বাস্তবতা এবং খেলোয়াড়দের স্বার্থ—সবকিছু বিবেচনায় নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর মতে, যদি নিরপেক্ষতা ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, তবে টুর্নামেন্টের গ্রহণযোগ্যতা বজায় থাকবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের সংকট মোকাবিলায় একটি দৃষ্টান্ত তৈরি হবে। অন্যথায়, ভেন্যু ও সূচি নিয়ে চলমান অনিশ্চয়তা টুর্নামেন্টের প্রস্তুতি ও অংশগ্রহণকারী দলগুলোর মানসিক প্রস্তুতিতে প্রভাব ফেলতে পারে।