অর্থনীতি প্রতিবেদক
দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতের প্রবৃদ্ধি ২০ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাস শেষে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি দাঁড়িয়েছে ১০ দশমিক ৮০ শতাংশে। অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির গতি তুলনামূলকভাবে স্থবির থাকলেও প্রবাসী আয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি এই প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করেছে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংক রোববার প্রকাশিত আমানতসংক্রান্ত তথ্যে দেখা যায়, ২০২৫ সালের নভেম্বর শেষে দেশের ব্যাংকগুলোতে মোট আমানতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১৯ লাখ ৫৩ হাজার কোটি টাকা। এক বছর আগে, অর্থাৎ ২০২৪ সালের নভেম্বর শেষে এ পরিমাণ ছিল ১৭ লাখ ৬২ হাজার কোটি টাকা। ফলে এক বছরের ব্যবধানে আমানতের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
এর আগের মাস অক্টোবর শেষে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ। সর্বশেষ ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে আমানতের প্রবৃদ্ধি ১০ শতাংশের ঘর অতিক্রম করেছিল, সে সময় প্রবৃদ্ধির হার ছিল ১০ দশমিক ৪৩ শতাংশ। সংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘ সময় পর আবারও ডাবল ডিজিট প্রবৃদ্ধিতে পৌঁছানো ব্যাংকিং খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।
অর্থনীতিবিদ ও ব্যাংকাররা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও আয় বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য গতি না থাকলেও রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়ায় ব্যাংক আমানত বেড়েছে। সাধারণত অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির সম্প্রসারণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি ও বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের উন্নতির ফলে মানুষের সঞ্চয় সক্ষমতা বাড়ে এবং তার প্রভাব পড়ে ব্যাংক আমানতে। তবে ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে মূল্যস্ফীতির তুলনায় মানুষের প্রকৃত আয়ে বড় ধরনের ইতিবাচক পরিবর্তন না হওয়ায় অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে আমানত বৃদ্ধির প্রবণতা সীমিত ছিল বলে ধারণা করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের সাবেক লিড অর্থনীতিবিদ ড. জাহিদ হোসেনের মতে, সাম্প্রতিক আমানত প্রবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে রেমিট্যান্স প্রবাহ। নভেম্বর ও ডিসেম্বর—এই দুই মাসে প্রবাসী আয় তুলনামূলকভাবে ভালো ছিল। ব্যাংকিং চ্যানেলে আসা বৈদেশিক মুদ্রার বিপরীতে যে টাকা পাওয়া যায়, তা মূলত ব্যাংকিং ব্যবস্থার মধ্যেই জমা থাকে। তিনি আরও বলেন, অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি এখনো পুরোপুরি সক্রিয় না হওয়ায় সেখান থেকে উল্লেখযোগ্য নতুন আমানত সৃষ্টি হয়নি।
ড. জাহিদ হোসেনের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ব্যাংকিং খাতে আগের মতো আতঙ্ক বা অনিশ্চয়তা না থাকায় আস্থার উন্নতি হয়েছে, যা আমানত ধরে রাখতে সহায়ক। তবে শুধু আস্থা বৃদ্ধির কারণেই আমানত প্রবৃদ্ধি হয়েছে—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন। কারণ ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিসংখ্যানে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে না।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে প্রবাসীরা ২ দশমিক ৮৮ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স পাঠিয়েছেন। এই বাড়তি রেমিট্যান্সের ফলে ব্যাংকগুলোর বৈদেশিক মুদ্রায় নেট ওপেন পজিশন বেড়েছে। অতিরিক্ত ডলার বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিক্রি করছে, যার বিপরীতে বাংলাদেশ ব্যাংক টাকা সরবরাহ করছে। এতে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় লিকুইডিটি বৃদ্ধি পাচ্ছে। চলতি অর্থবছরের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে মোট ৩ দশমিক ৭৫ বিলিয়ন ডলার কিনেছে।
মিডল্যান্ড ব্যাংক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আহসান-উজ জামান জানান, কেন্দ্রীয় ব্যাংক নিলামের মাধ্যমে ডলার কেনায় বাজারে তারল্য বাড়ছে, যা পরোক্ষভাবে ব্যাংক আমানত বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে। পাশাপাশি সাম্প্রতিক সময়ে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠনের ফলে কিছু আমানত এক ব্যাংক থেকে অন্য ব্যাংকে স্থানান্তরিত হয়েছে, যা সামগ্রিক আমানত প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে প্রভাব ফেলেছে।
একটি বেসরকারি ব্যাংকের ট্রেজারি বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়লে সাধারণত ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধিও বাড়ে। ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসের তথ্য বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই সময়ে কেবল আগস্ট ও নভেম্বর মাসেই আমানতের প্রবৃদ্ধি ডাবল ডিজিটে পৌঁছেছে।
এদিকে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থের পরিমাণ কিছুটা কমেছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের নভেম্বর মাসে ব্যাংকের বাইরে থাকা নগদ অর্থ আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় ৩ দশমিক ০৪ শতাংশ কমে দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৬৯ হাজার কোটি টাকায়। ২০২৪ সালের নভেম্বর মাসে এ পরিমাণ ছিল ২ লাখ ৭৭ হাজার কোটি টাকা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, ধীরে ধীরে নগদ অর্থ আবার আনুষ্ঠানিক ব্যাংকিং ব্যবস্থায় ফিরে আসছে, যদিও পুরোপুরি স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরতে এখনও সময় লাগবে।