আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক রয়েছে—এমন সব দেশের পণ্যের ওপর ২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের ঘোষণা দিয়েছেন। সোমবার দেওয়া এই ঘোষণার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এসব দেশের সব ধরনের বাণিজ্যে অতিরিক্ত শুল্ক কার্যকর হবে বলে জানানো হয়েছে। ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ টানা তৃতীয় সপ্তাহে গড়ানোর প্রেক্ষাপটে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক চাপ আরও বাড়াতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ঘোষণায় ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ইরানের সঙ্গে যেকোনো ধরনের ব্যবসায় যুক্ত দেশগুলোকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে তাদের সব বাণিজ্যে ২৫ শতাংশ শুল্ক দিতে হবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, এই সিদ্ধান্ত অবিলম্বে কার্যকর হবে এবং এটি চূড়ান্ত। তবে ‘ইরানের সঙ্গে ব্যবসা’ বলতে ঠিক কোন পর্যায়ের লেনদেন বা কোন খাতগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, সে বিষয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।
হোয়াইট হাউস থেকেও শুল্ক আরোপ সংক্রান্ত অতিরিক্ত তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। কোন কোন দেশের কোন পণ্য বা খাত সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে, তা স্পষ্ট করা হয়নি। এতে করে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের ধারণা।
বর্তমানে ইরানের সবচেয়ে বড় বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে চীনের নাম উঠে আসে। এ ছাড়া ইরাক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক ও ভারত ইরানের সঙ্গে উল্লেখযোগ্য বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখছে। নতুন এই শুল্ক ব্যবস্থা কার্যকর হলে এসব দেশের যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যে সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে এবং বৈশ্বিক বাজারে পণ্যের দাম ও সরবরাহে পরিবর্তন আসার আশঙ্কা রয়েছে।
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান আগেই কঠোর ছিল। এর আগে বিক্ষোভ দমনে প্রাণহানির ঘটনায় সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল। সোমবার হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র জানান, বিমান হামলাসহ বিভিন্ন ধরনের সামরিক বিকল্প এখনো যুক্তরাষ্ট্রের বিবেচনায় রয়েছে। তবে এ বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়নি।
ইরানে চলমান বিক্ষোভের সূত্রপাত ঘটে দেশটির মুদ্রা রিয়ালের দ্রুত অবমূল্যায়নের পর। গত বছরের ডিসেম্বরের শেষ দিকে রিয়ালের মান ব্যাপকভাবে কমে যাওয়ায় ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ তেহরানের রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ শুরু করেন। ধীরে ধীরে এই আন্দোলন দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে এবং এখন তা ইরানের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের রাজনৈতিক বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে।
মানবাধিকার পর্যবেক্ষণকারী সংস্থাগুলোর তথ্যমতে, চলমান বিক্ষোভে কয়েক শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছেন, যাদের মধ্যে বিক্ষোভকারী ও নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য উভয়ই রয়েছেন। এ ছাড়া হাজার হাজার মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে দেশজুড়ে ইন্টারনেট সংযোগ বন্ধ বা সীমিত থাকায় প্রকৃত হতাহতের সংখ্যা এবং পরিস্থিতির পূর্ণাঙ্গ তথ্য যাচাই করা কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউটের কারণে আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম এবং মানবাধিকার সংগঠনগুলোর জন্য ইরানের ভেতর থেকে তথ্য সংগ্রহ ও প্রচার কার্যত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে করে দেশটির ভেতরের পরিস্থিতি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাওয়া সীমিত হয়ে পড়েছে।
ইরানের অর্থনীতি দীর্ঘদিন ধরেই আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার চাপে রয়েছে, বিশেষ করে দেশটির পারমাণবিক কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে আরোপিত নিষেধাজ্ঞাগুলো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে। এর পাশাপাশি সরকারি অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির অভিযোগও অর্থনৈতিক সংকটকে আরও গভীর করেছে।
গত এক বছরে ইরানের মুদ্রার মান রেকর্ড পরিমাণে কমেছে এবং একই সময়ে মুদ্রাস্ফীতি ৪০ শতাংশের বেশি ছাড়িয়েছে। এর ফলে ভোজ্য তেল, মাংসসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে গেছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির এই চাপই সাম্প্রতিক বিক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত ইরানের ওপর আন্তর্জাতিক চাপ আরও বাড়াবে। একই সঙ্গে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখা দেশগুলোকেও নতুন করে কূটনৈতিক ও অর্থনৈতিক হিসাব-নিকাশ করতে বাধ্য করবে, যা বৈশ্বিক রাজনীতি ও অর্থনীতিতে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।