জাতীয় ডেস্ক
বাংলাদেশের আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অংশগ্রহণমূলক করার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের হাউস অব কমন্সের চার সদস্য। তারা বলেছেন, সব প্রধান রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া অনুষ্ঠিত কোনো নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক বলা যায় না এবং এমন নির্বাচন দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
হাউস অব কমন্সের সদস্য বব ব্ল্যাকম্যান, জিম শ্যানন, জ্যাস আথওয়াল ও ক্রিস ল এক যৌথ বিবৃতিতে বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে তাদের অবস্থান তুলে ধরেন। বিবৃতিতে তারা উল্লেখ করেন, ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠেয় জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। তাদের মতে, এই নির্বাচন দেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
বিবৃতিতে বলা হয়, ন্যায়সঙ্গত ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন তখনই সম্ভব, যখন সেটি হবে অংশগ্রহণমূলক এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের দৃষ্টিতে নিরপেক্ষ। চার এমপি বলেন, নৈতিক বিবেচনাবোধ থেকে প্রত্যাশা করা হয়—এই নির্বাচন একটি স্থিতিশীল ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ গঠনে সহায়ক হবে। তবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় সব দলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত না হলে সেই লক্ষ্য অর্জন কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
তারা সাম্প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটের দিকে ইঙ্গিত করে জানান, জুলাইয়ের অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার প্রেক্ষাপটে গত বছরের মে মাসে আওয়ামী লীগের সব ধরনের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয় এবং একই সময়ে দলটির রাজনৈতিক নিবন্ধন স্থগিত করা হয়। এই সিদ্ধান্তগুলোর ফলে দেশের রাজনৈতিক পরিবেশে প্রভাব পড়েছে বলে বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়।
চার ব্রিটিশ এমপি বলেন, ব্যাপক জনসমর্থন থাকা রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা নিয়ে তারা উদ্বিগ্ন। তাদের মতে, এ ক্ষেত্রে জাতিসংঘসহ যুক্তরাজ্য ও বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের মিত্র দেশগুলোর পরামর্শ যথাযথভাবে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। তারা সতর্ক করেন, মুক্ত, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন না হলে বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক নাগরিক ভোটাধিকার প্রয়োগ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন এবং এতে ভোটার অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, সব প্রধান রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহণ ছাড়া কোনো নির্বাচনকে গণতান্ত্রিক বলা যায় না। একই সঙ্গে তারা উল্লেখ করেন, ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকার অনির্বাচিত হওয়া সত্ত্বেও ভোটারদের ওপর যেসব বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে, সেগুলো রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ সংকুচিত করেছে বলে তাদের ধারণা।
বাংলাদেশের রাজনীতিকে দীর্ঘদিন ধরে চরমভাবে বিভক্ত হিসেবে উল্লেখ করে চার এমপি বলেন, এই বিভাজনের জন্য দেশের সব রাজনৈতিক দলেরই কিছু না কিছু দায় রয়েছে। তবে জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠা এবং স্থবির হয়ে পড়া অর্থনৈতিক উন্নয়ন পুনরায় গতিশীল করতে ভবিষ্যতের যেকোনো সরকারকে জনগণের সম্মতির ভিত্তিতে দেশ পরিচালনা করতে হবে। তাদের মতে, নির্বাচন এমনভাবে অনুষ্ঠিত হওয়া প্রয়োজন, যাতে তা রাজনৈতিক বৈধতা ও জনসমর্থন নিশ্চিত করতে পারে।
বিবৃতিতে নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে রাজনৈতিক বহুত্ববাদের একটি সংস্কৃতি গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়। সেখানে উল্লেখ করা হয়, বিরোধী দলগুলো যেন গঠনমূলক ভূমিকা রাখতে পারে এবং রাজনৈতিক মতপার্থক্য গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই সমাধান করা যায়—এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি।
যুক্তরাজ্যকে বাংলাদেশের অন্যতম ঘনিষ্ঠ অংশীদার হিসেবে উল্লেখ করে চার এমপি বলেন, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত আটক, বিচার ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে পাওয়া বিশ্বাসযোগ্য তথ্য তাদের উদ্বিগ্ন করেছে। তারা এসব বিষয়কে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার জন্য চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখছেন।
বিবৃতির শেষাংশে ব্রিটিশ সরকারসহ জাতিসংঘের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর প্রতি আহ্বান জানানো হয়, যাতে ড. মুহাম্মদ ইউনূস গণতান্ত্রিক নীতির প্রতি তার অঙ্গীকার বজায় রাখেন, বাংলাদেশের সব নাগরিকের নাগরিক অধিকার সুরক্ষিত থাকে এবং একটি মুক্ত, সুষ্ঠু ও অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন নিশ্চিত করা যায়।