রাজনীতি ডেস্ক
গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিভিন্ন পর্যায়ে আওয়ামী লীগ সরকারের শাসনামলে গুম, খুন ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর চেয়ারম্যান তারেক রহমান। শনিবার (১৭ জানুয়ারি) সকালে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে এ সভা শুরু হয় এবং প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তা চলমান ছিল।
সভায় প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান। আয়োজনে দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে আগত ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা অংশ নেন। সভায় তারা নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন এবং স্বজনদের গুম, হত্যাকাণ্ড বা নির্যাতনের ঘটনায় কীভাবে পরিবারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সে বিষয়ে বক্তব্য দেন। একই সঙ্গে তারা এসব ঘটনার বিচার ও রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতির দাবি জানান।
বক্তব্যে অংশগ্রহণকারীরা জানান, বিভিন্ন সময়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পরিচয়ে কিংবা অজ্ঞাত ব্যক্তিদের হাতে তাদের স্বজনরা নিখোঁজ হন। দীর্ঘদিন পর কারও সন্ধান মিলেছে মৃত অবস্থায়, আবার অনেকের ভাগ্যে এখনো কোনো তথ্য জোটেনি। অনেক পরিবার অভিযোগ করেন, এসব ঘটনার পর থানায় সাধারণ ডায়েরি বা মামলা করতে গিয়ে তারা প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়েছেন এবং কার্যকর তদন্তের অভাব লক্ষ্য করেছেন।
সভায় আলোচনায় উঠে আসে, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের ফলে শুধু একটি ব্যক্তি নয়, পুরো পরিবার সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক সংকটে পড়ে। পরিবারের উপার্জনক্ষম সদস্য হারানোর কারণে অনেক পরিবার আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভুগছে। শিশুদের শিক্ষা ব্যাহত হচ্ছে এবং পরিবারের সদস্যরা দীর্ঘদিন ধরে মানসিক চাপ ও নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে জীবনযাপন করছেন বলে তারা জানান।
বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান তার বক্তব্যে ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর বক্তব্য শোনেন এবং বিষয়গুলো নথিবদ্ধ করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে সংঘটিত এসব অভিযোগ রাষ্ট্রের আইনি ও সাংবিধানিক কাঠামোর জন্য গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে। তার বক্তব্যে মানবাধিকার রক্ষা, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার প্রয়োজনীয়তার বিষয়টি উঠে আসে।
সভায় বিএনপির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ ও বিভিন্ন অঙ্গসংগঠনের প্রতিনিধিরাও উপস্থিত ছিলেন। তারা বলেন, অতীতে সংঘটিত গুম ও নির্যাতনের অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু তদন্ত না হলে ভবিষ্যতে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া দুর্বল হয়ে পড়তে পারে। এ কারণে নিরপেক্ষ তদন্ত কমিশন গঠন এবং ভুক্তভোগীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়েও আলোচনা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড সংক্রান্ত অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচিত। মানবাধিকার সংস্থাগুলো বিভিন্ন সময়ে এসব ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত ও দায়ীদের জবাবদিহির দাবি জানিয়ে এসেছে। এ ধরনের সভা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারকদের সামনে তুলে ধরার একটি প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করতে পারে বলে তারা মনে করেন।
সভায় অংশ নেওয়া কয়েকজন পরিবারের সদস্য জানান, তারা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার অংশ হিসেবে এসব ঘটনার শিকার হয়েছেন বলে বিশ্বাস করেন। তারা বলেন, ভবিষ্যতে যেন এ ধরনের ঘটনা আর না ঘটে, সে জন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। একই সঙ্গে তারা ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে সমাজে আস্থা ফেরানোর আহ্বান জানান।
সভা শেষে বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়, ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর অভিযোগ ও বক্তব্য দলীয়ভাবে সংরক্ষণ করা হবে এবং পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে রাজনৈতিক ও আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় আনা হবে। আয়োজকদের মতে, এই মতবিনিময় সভা গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সময় সংঘটিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগগুলোকে একটি কাঠামোগত আলোচনার মধ্যে আনার উদ্যোগের অংশ।