আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইউক্রেনজুড়ে রাতভর রাশিয়ার ব্যাপক ড্রোন হামলায় অন্তত দুইজন নিহত হয়েছেন এবং বহু মানুষ আহত হয়েছেন। একই সঙ্গে দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহে নতুন করে সংকটের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। চলমান যুদ্ধের মধ্যে শীতকালীন সময়ে এ ধরনের হামলা ইউক্রেনের বেসামরিক জীবন ও জরুরি সেবাব্যবস্থার ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রোববার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বিবৃতিতে ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি জানান, সুমি, খারকিভ, ডিনিপ্রো, জাপোরিঝিয়া, খমেলনিটস্কি ও ওডেসা অঞ্চলে একযোগে ২০০টিরও বেশি ড্রোন ব্যবহার করে হামলা চালানো হয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই হামলার মূল লক্ষ্য ছিল বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ ব্যবস্থাসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো। এর আগে রুশ হামলায় বিদ্যুৎকেন্দ্র ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ আমদানির নির্দেশ দেন জেলেনস্কি।
ইউক্রেনীয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ড্রোন হামলার ফলে কয়েকটি অঞ্চলে আবাসিক এলাকা ও অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কিছু এলাকায় বিস্ফোরণের কারণে ঘরবাড়ি, শিল্প স্থাপনা ও বিদ্যুৎ লাইনে আগুন ধরে যায়। জরুরি সেবাদানকারী সংস্থাগুলো রাতভর উদ্ধার ও আগুন নেভানোর কাজ চালায়। হতাহতদের মধ্যে বেসামরিক নাগরিক রয়েছে বলে প্রাথমিক তথ্যে জানা গেছে।
স্থানীয় সময় শনিবারও খারকিভ ও সুমি অঞ্চলে রাশিয়ার হামলায় গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ওই হামলায় বিদ্যুৎ ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হয় এবং কিছু এলাকায় বিদ্যুৎ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিকল্প সরবরাহ ব্যবস্থা চালু করার চেষ্টা চলছে। তবে ধারাবাহিক হামলার কারণে মেরামত ও পুনরুদ্ধার কার্যক্রম বারবার বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ইউক্রেনের জ্বালানি খাতের কর্মকর্তারা বলছেন, শীতকালকে সামনে রেখে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও তাপ সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর আঘাত দেশটির জন্য বিশেষভাবে উদ্বেগজনক। তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিদ্যুৎ ও গ্যাসের চাহিদা বেড়ে যায়। এই অবস্থায় অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হলে হাসপাতাল, পানি সরবরাহ ব্যবস্থা ও অন্যান্য জরুরি সেবার কার্যক্রম ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি তার বক্তব্যে বলেন, বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো আন্তর্জাতিক মানবিক আইনের লঙ্ঘন। তিনি ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা জোরদার করতে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছ থেকে আরও সহায়তার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো দ্রুত মেরামতের জন্য দেশীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করেন।
অন্যদিকে রাশিয়া আগেও দাবি করেছে, তাদের সামরিক অভিযান ইউক্রেনের সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করার লক্ষ্যেই পরিচালিত হচ্ছে। তবে ইউক্রেনীয় পক্ষের অভিযোগ, হামলার বড় অংশই বিদ্যুৎকেন্দ্র, তাপ সরবরাহ ব্যবস্থা ও বেসামরিক স্থাপনাকে লক্ষ্য করে চালানো হচ্ছে, যার প্রভাব সরাসরি সাধারণ জনগণের ওপর পড়ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, সাম্প্রতিক ড্রোন হামলা যুদ্ধের নতুন পর্যায়ে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। বিশেষ করে শীতকালীন সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি অবকাঠামোতে আঘাত ইউক্রেনের অর্থনীতি ও জনজীবনে দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে ইউরোপজুড়ে জ্বালানি নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হতে পারে, কারণ ইউক্রেনের বিদ্যুৎ ব্যবস্থার ওপর আঞ্চলিক সহযোগিতার একটি অংশ নির্ভরশীল।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ নাগরিকদের নিরাপদ স্থানে থাকার আহ্বান জানিয়েছে এবং সম্ভাব্য নতুন হামলার আশঙ্কায় সতর্কতা জারি রেখেছে। উদ্ধার ও পুনর্বাসন কার্যক্রম অব্যাহত থাকলেও ধারাবাহিক হামলার মধ্যে দেশটির জন্য মানবিক ও অবকাঠামোগত চ্যালেঞ্জ আরও গভীর হচ্ছে।