বাংলাদেশ ডেস্ক
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে গবেষণা ও সমস্যা চিহ্নিতকরণের ওপর গুরুত্ব আরোপ করেছেন। তিনি বলেছেন, দেশের স্থলভাগের সমপরিমাণ জলভাগ থাকা সত্ত্বেও এর সম্পদ যথাযথভাবে ব্যবহার করা হয়নি এবং সম্পদের পরিমাণ ও সম্ভাবনা সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এই সম্পদকে কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পর্যাপ্ত গবেষণা ও নীতিগত সহায়তা প্রয়োজন বলে তিনি উল্লেখ করেন।
এ বিষয়ে মঙ্গলবার সকালে রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় অনুষ্ঠিত এক সভায় প্রধান উপদেষ্টা এসব মন্তব্য করেন। সভায় উপস্থিত ছিলেন মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার, প্রধান উপদেষ্টার আন্তর্জাতিক বিষয়ক বিশেষ দূত লুৎফে সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সামুদ্রিক বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সায়েদুর রহমান চৌধুরী এবং মৎস্য অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক ড. মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন। সভার তথ্য প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইং থেকে সরবরাহ করা হয়।
জাহাজ আর.ভি. ড. ফ্রিডটজফ ন্যানসেনু মাধ্যমে পরিচালিত সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ও ইকোসিস্টেম জরিপের প্রতিবেদন প্রধান উপদেষ্টার কাছে জমা দেওয়া হয়েছে। এই জরিপ গত বছরের ২১ আগস্ট থেকে ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত পরিচালিত হয়। এতে আটটি দেশের ২৫ জন বিজ্ঞানী অংশ নেন, যার মধ্যে ১৩ জন বাংলাদেশি।
অধ্যাপক সায়েদুর রহমান বৈঠকে গবেষণার তথ্য-উপাত্ত তুলে ধরেন। তিনি জানান, গবেষণায় ৬৫টি নতুন জলজ প্রাণির প্রজাতির অস্তিত্ব পাওয়া গেছে। এছাড়া গভীর সমুদ্রে জেলিফিশের আধিক্য বাড়ার তথ্য পাওয়া গেছে, যা ভারসাম্যহীনতার ইঙ্গিত বহন করে। অতিরিক্ত মাছ ধরার ফলে এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
গবেষণায় দুই হাজার মিটার গভীরতাতেও প্লাস্টিকের উপস্থিতি ধরা পড়েছে, যা গভীর উদ্বেগের বিষয়। ২০১৮ সালের গবেষণার সঙ্গে তুলনা করে দেখা গেছে, গভীর সমুদ্রে বড় মাছের সংখ্যা কমছে এবং স্বল্প গভীর সমুদ্রে মাছের পরিমাণ আশঙ্কাজনকভাবে হ্রাস পেয়েছে। বর্তমানে ২৭০–২৮০টি বড় মাছ ধরার ট্রলার গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণ করছে। এর মধ্যে ৭০টি ট্রলার শব্দতরঙ্গ নির্ভর প্রযুক্তি ব্যবহার করে লক্ষ্যভিত্তিক মাছ ধরায় নিয়োজিত। এই পদ্ধতি গভীর সমুদ্রে মাছ ধরেন জেলেদের জন্য লাভজনক হলেও স্বল্প গভীরতায় মাছ ধরেন জেলেদের জন্য ক্ষতিকর।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ উপদেষ্টা ফরিদা আখতার বলেন, লক্ষ্যভিত্তিক মাছ ধরা চলতে থাকলে বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদ শূন্য হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সরকার এই প্রযুক্তি ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
গবেষণায় বাংলাদেশের গভীর সমুদ্রে টুনা মাছের উপস্থিতি এবং এর সম্ভাব্য সম্পদের তথ্য উঠে এসেছে। পাশাপাশি সুন্দরবনের নিচে একটি মাছের প্রজনন ক্ষেত্রের সন্ধান পাওয়া গেছে, যা সংরক্ষণের জন্য ইতোমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
সভায় আরও জানানো হয়, যুক্তরাজ্যের রাজকীয় নৌবাহিনীর একটি বহুমুখী জলতল পরিমাপ ও সমুদ্রবিজ্ঞান জরিপ জাহাজ বর্তমানে বাংলাদেশ নৌবাহিনীর কাছে হস্তান্তরের প্রক্রিয়ায় রয়েছে। এই জাহাজ সমুদ্রের তলদেশ, গভীরতা এবং অন্যান্য সামুদ্রিক তথ্য সংগ্রহ করবে, যা বাংলাদেশের সামুদ্রিক গবেষণা ও সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও মালদ্বীপের সঙ্গে যৌথ গবেষণা সমন্বয়ের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, “সমস্যাগুলো আগে চিহ্নিত করতে হবে। বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সমন্বিত গবেষণার মাধ্যমে দেশের অর্থনীতির নতুন দিগন্ত উন্মোচিত হবে।”