জাতীয় ডেস্ক
নির্বাচন কমিশন (ইসি) আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করতে আচরণবিধি প্রতিপালন ও অনিয়ম প্রতিরোধে মাঠ পর্যায়ে তিন স্তরের বিশেষ পর্যবেক্ষণ কাঠামো গঠনের নির্দেশ দিয়েছে। এর আওতায় ‘ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম’, ‘নির্বাচন মনিটরিং টিম’ এবং ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল’ গঠনের কথা বলা হয়েছে। ইসি সচিবালয়ের নির্বাচন পরিচালনা-২ অধিশাখার উপসচিব মোহাম্মদ মনির হোসেন স্বাক্ষরিত পরিপত্রে সম্প্রতি এ নির্দেশনা জারি করা হয়।
ইসি সচিবালয়ের পরিচালক (জনসংযোগ) ও তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমিন মল্লিক বুধবার (৭ জানুয়ারি) জানান, ভোটারদের নির্বিঘ্ন কেন্দ্রে যাওয়া, নিরাপদে ভোট প্রদান এবং ভোট শেষে সুরক্ষিতভাবে বাড়ি ফেরার পরিবেশ নিশ্চিত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য। পরিপত্রের আলোকে রিটার্নিং অফিসার ও সহকারী রিটার্নিং অফিসাররা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম শুরু করেছেন।
পরিপত্রে উল্লেখ করা হয়, নির্বাচন-পূর্ব অনিয়ম প্রতিরোধে কমিশন বিভিন্ন কমিটি ও সেলের কার্যপরিধি নির্ধারণ করেছে, যাতে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ ১৯৭২, সংসদ নির্বাচনে রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর আচরণবিধি ২০২৫, নির্বাচন ব্যয়–সংক্রান্ত সীমা, প্রচার বিধি ও আইনগত বাধ্যবাধকতা যথাযথভাবে প্রতিপালিত হয়। কমিটিগুলো আইন, বিধিমালা ও প্রচলিত পদ্ধতি অনুসরণ করে দায়িত্ব পালন করবে।
ডেস্কভিত্তিক নির্দেশনার অংশ হিসেবে রিটার্নিং অফিসারদের নিরপেক্ষতা ও গ্রহণযোগ্যতা রক্ষায় কয়েকটি মৌলিক নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে— আইন ও আচরণবিধির আলোকে নিশ্চিত করা যে, বিশেষ কোনো মহল বা পক্ষের প্রভাব বা হস্তক্ষেপে নির্বাচনের নিরপেক্ষতা যেন ক্ষুণ্ন না হয়; সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের এমন কোনো কাজ থেকে বিরত থাকা, যাতে কর্তৃপক্ষ বা জনগণের কাছে তারা হেয় প্রতিপন্ন হন; জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে যৌথ সভা আয়োজন করে ভোটারদের উদ্বুদ্ধ করা; পাশাপাশি স্থানীয় রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ ও সমন্বয় বজায় রাখা।
নির্দেশনায় আরও বলা হয়, ভোটারদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভ্রাম্যমাণ ইউনিটকে কেন্দ্রভিত্তিক ও এলাকাভিত্তিক নিবিড় টহল দিতে হবে; ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা ও গুরুত্বপূর্ণ ভোটকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে; যেকোনো অশুভ তৎপরতা প্রতিরোধে বাহিনীকে সতর্ক ও কঠোর নির্দেশনায় প্রস্তুত রাখতে হবে; ভোটকেন্দ্রের তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার পর কেন্দ্রগুলোর অবস্থান সম্পর্কে ব্যাপক প্রচার নিশ্চিত করতে হবে।
ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিমের কাঠামো ও দায়িত্ব
পরিপত্র অনুযায়ী, জেলা ও মেট্রোপলিটন এলাকায় রিটার্নিং অফিসার এবং উপজেলা পর্যায়ে সহকারী রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে ‘ভিজিল্যান্স ও অবজারভেশন টিম’ গঠিত হবে। টিমে বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তা ও বেসরকারি পর্যায়ের নির্দলীয় বিশিষ্ট ব্যক্তিরা সদস্য হিসেবে অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। টিমের প্রধান কার্যক্রমের মধ্যে রয়েছে— আচরণবিধি ২০২৫ সরেজমিনে প্রতিপালন পর্যবেক্ষণ; নির্বাচনি ব্যয় নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করছে কি না, তা নিয়মিত তদারকি; আচরণবিধি ভঙ্গের ঘটনা শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বা নির্বাচনি তদন্ত কমিটিকে অবহিত করা; বিধি-নিষেধ লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে মামলা দায়ের ও প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ; নির্বাচনি এলাকার সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে প্রতিদিন কমিশনে প্রতিবেদন প্রেরণ।
নির্বাচন মনিটরিং টিমের গঠন ও ভূমিকা
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে ‘নির্বাচন মনিটরিং টিম’ গঠন করতে হবে। এই টিম মূলত প্রার্থী ও কমিশনের মধ্যে সমন্বয়, অভিযোগ দ্রুত নিষ্পত্তি, প্রচার–সংক্রান্ত ব্যাখ্যা, নির্বাচনি ব্যয় পর্যবেক্ষণে সহযোগিতা এবং তথ্য প্রবাহ স্বচ্ছ রাখতে সহায়ক কাঠামো হিসেবে কাজ করবে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেলের কাঠামো ও কার্যপরিধি
নির্বাচনি এলাকায় শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে রিটার্নিং অফিসারের নেতৃত্বে ‘আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী সেল’ গঠন হবে। সেলে আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা, জেলা নির্বাচন অফিসার, পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি, সেনা, নৌ, বিমান বাহিনী ও অন্যান্য বাহিনীর মনোনীত কর্মকর্তারা অন্তর্ভুক্ত থাকবেন। সেলের দায়িত্ব— নির্বাচনি এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষা, সহিংসতা প্রতিরোধ, ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র শনাক্তে গোয়েন্দা তথ্য সমন্বয়, ভোটকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে মোতায়েন পরিকল্পনা তদারকি, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার অভিযান জোরদার করা, চিহ্নিত সন্ত্রাসী, চাঁদাবাজ ও মাস্তানদের গ্রেপ্তারে অভিযান পরিচালনা এবং সার্বিক পরিস্থিতি সম্পর্কে কমিশন সচিবালয়কে নিয়মিত অবহিত করা।
অতিরিক্ত নিরাপত্তা ও ভোটার অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ ব্যবস্থা
পরিপত্রে আরও বলা হয়, ভোটাররা যাতে নির্ভয়ে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারেন, সে জন্য রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীদের সঙ্গে বৈঠক করে সহযোগিতা নিশ্চিত করতে হবে; নারী ভোটারসহ সব শ্রেণির ভোটারকে নিরাপদ পরিবেশে ভোটদানে উদ্বুদ্ধ করতে হবে; গোলযোগপূর্ণ বা ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রে অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করতে হবে; উসকানিমূলক বক্তব্য, পেশিশক্তি, আর্থিক প্রভাব ও আচরণবিধি লঙ্ঘন প্রতিরোধে তাৎক্ষণিক কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা প্রণয়ন
নির্বাচনের সার্বিক কার্যক্রম শান্তিপূর্ণভাবে সম্পন্ন করতে পুলিশ সুপার বা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনারের সঙ্গে সমন্বয় করে বিস্তারিত কর্মপরিকল্পনা তৈরি করতে হবে। ভোটকেন্দ্র ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ভ্রাম্যমাণ টিম মোতায়েন করে নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ভোটদানের নিশ্চয়তা দিতে হবে এবং সেই কর্মপরিকল্পনা কমিশন সচিবালয়কে জানাতে হবে।
এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মাঠ পর্যায়ে নির্বাচনি আচরণবিধি প্রতিপালন, ব্যয় সীমা তদারকি, দ্রুত আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সমন্বিত উপস্থিতির মাধ্যমে অনিয়ম ও সহিংসতার ঝুঁকি কমিয়ে নির্বাচনকে অধিকতর অংশগ্রহণমূলক, স্বচ্ছ ও গ্রহণযোগ্য করার পথ সুগম হবে।