প্রবাস ডেস্ক
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও সংযুক্ত গণভোটে অংশ নিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিবন্ধিত প্রবাসী ভোটারদের কাছে এ পর্যন্ত ৬ লাখ ৭৭ হাজার ২৩৩টি পোস্টাল ব্যালট পাঠানো হয়েছে। নির্বাচন কমিশনের অধীনে পরিচালিত আউট অব কান্ট্রি ভোটিং সিস্টেম অ্যান্ড ইমপ্লিমেন্টেশন (ওসিভি-এসডিআই) প্রকল্পের টিম লিডার সালীম আহমাদ খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
নির্বাচন কমিশনের (ইসি) হালনাগাদ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পোস্টাল ব্যালটের মাধ্যমে ভোট প্রদানে ‘পোস্টাল ভোট বিডি’ অ্যাপ ব্যবহার করে মোট ১৫ লাখ ৩৩ হাজার ৬৮৩ জন ভোটার নিবন্ধন সম্পন্ন করেছেন। এর মধ্যে দেশের অভ্যন্তরে ‘ইন-কান্ট্রি পোস্টাল ভোট’ শ্রেণিতে নিবন্ধিত হয়েছেন ৭ লাখ ৬১ হাজার ১৪১ জন এবং দেশের বাইরে অবস্থানরত প্রবাসী ভোটার নিবন্ধনের সংখ্যা ৭ লাখ ৭২ হাজার ৫৪২ জন।
প্রবাসী ভোটারদের কাছে ব্যালট প্রেরণ কার্যক্রমকে নির্বাচনপূর্ব লজিস্টিক ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ওসিভি-এসডিআই প্রকল্প সূত্র জানায়, ব্যালট প্রেরণের পুরো প্রক্রিয়া কয়েকটি স্তরে সম্পন্ন হচ্ছে—ভোটার ডাটাবেজ যাচাই, ব্যালট প্যাকেট প্রস্তুত, নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা সুরক্ষা নিশ্চিত, আন্তর্জাতিক ডাক ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রেরণ এবং বিতরণ পর্যবেক্ষণ। এই প্রক্রিয়ায় ডাক বিভাগের আন্তর্জাতিক চ্যানেল, বাংলাদেশ মিশনসমূহের সমন্বয়, এবং প্রকল্প টিমের ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা ব্যবহার করা হচ্ছে।
সালীম আহমাদ খান জানিয়েছেন, আগামী ১০ জানুয়ারির মধ্যে ব্যালট প্রেরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে টিম নিরবচ্ছিন্নভাবে কাজ করছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, ব্যালট প্যাকেটসমূহ প্রবাসীদের কাছে প্রতীক বরাদ্দের আগেই পৌঁছানোর চেষ্টা চলছে, যাতে ভোটাররা প্রতীক জানার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যে ব্যালটে সিল প্রদান করে ফেরত পাঠাতে পারেন। ইসি ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী আগামী ২১ জানুয়ারি নির্বাচনী প্রতীক বরাদ্দ প্রদান করা হবে। প্রকল্প টিম আশা করছে, প্রতীক বরাদ্দের আগেই ব্যালট বিতরণ উল্লেখযোগ্য অংশে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে।
নির্বাচন কমিশন সূত্র জানায়, গত ৬ জানুয়ারি সন্ধ্যায় ৪১ হাজার ৪৬৪ জন প্রবাসী ভোটারের কাছে ব্যালট পাঠানো হয়েছে, যা ছিল চলমান প্রেরণ কার্যক্রমের একটি ধাপ। এই ধাপে সিঙ্গাপুরে সর্বোচ্চ ১৭ হাজার ৭৫৯টি এবং সৌদি আরবে ১২ হাজার ব্যালট প্রেরণ করা হয়েছে। এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা, পূর্ব এশিয়া ও আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে পর্যায়ক্রমে ব্যালট পাঠানোর কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে।
দেশভিত্তিক ব্যালট প্রেরণের অগ্রাধিকার নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় বিবেচনায় নেয়া হচ্ছে—বাংলাদেশি অভিবাসীর ঘনত্ব, ডাক সেবার বিতরণ সময়, মিশনভিত্তিক সহায়তা সক্ষমতা, এবং ভোটার নিবন্ধনের সংখ্যা। ইসির তথ্য অনুযায়ী, অ্যাপ-ভিত্তিক নিবন্ধনে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে আগ্রহ সবচেয়ে বেশি লক্ষ্য করা গেছে। সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, কুয়েত, ওমান, বাহরাইনসহ উপসাগরীয় দেশগুলোতে কর্মরত বাংলাদেশিদের একটি বড় অংশ পোস্টাল ভোট ব্যবস্থায় নিবন্ধন করেছেন। পাশাপাশি মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, দক্ষিণ কোরিয়া, জাপান, অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, ইতালি, স্পেন, জার্মানি, কানাডা, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিভিন্ন দেশে নিবন্ধনের হার উল্লেখযোগ্য।
পোস্টাল ব্যালটের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা প্রসঙ্গে প্রকল্পের টিম লিডার স্পষ্ট করে জানিয়েছেন—ব্যালটের গোপনীয়তা সুরক্ষার আইনগত দায় ভোটারের ওপর বর্তায়। ব্যালট প্যাকেটে একটি স্বতন্ত্র শনাক্তকরণ নম্বর, সুরক্ষিত খাম, এবং ভোট প্রদান-পরবর্তী ফেরত পাঠানোর নির্দিষ্ট নির্দেশনা সংযুক্ত থাকছে। ভোটার ব্যালটে সিল প্রদান শেষে নির্ধারিত খামে তা সিলগালা করে সরাসরি আন্তর্জাতিক ডাক চ্যানেলে ফেরত পাঠাতে পারবেন, যা ইসির ডাক গ্রহণ কেন্দ্রে জমা হবে এবং গণনার আগ পর্যন্ত সুরক্ষিত সংরক্ষণে রাখা হবে।
ইসি জানিয়েছে, গোপনীয়তা লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সাময়িকভাবে ব্লক করার মতো প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেয়া হতে পারে। এর মূল উদ্দেশ্য ব্যালটের সুরক্ষা নিশ্চিত করা, প্রভাবমুক্ত ভোট পরিবেশ বজায় রাখা এবং পোস্টাল ভোট ব্যবস্থার প্রতি আস্থা সংরক্ষণ। পোস্টাল ভোট গণনার সময়, গ্রহণ, সংরক্ষণ, ও গণনা পর্যায়ে আলাদা পর্যবেক্ষণ কাঠামো ও অডিট ট্রেইল সংরক্ষণ করা হবে বলে ইসি সূত্র নিশ্চিত করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রবাসী ভোটারদের জন্য পোস্টাল ব্যালট ব্যবস্থা চালু বাংলাদেশি নির্বাচন ব্যবস্থায় একটি কাঠামোগত পরিবর্তন, যা ভবিষ্যতে বিদেশে অবস্থানরত নাগরিকদের ভোটাধিকার প্রয়োগ সহজতর করবে। তবে এর সাফল্য নির্ভর করছে ব্যালট প্রেরণ ও ফেরত গ্রহণের সময়ানুবর্তিতা, গোপনীয়তার সুরক্ষা, আন্তর্জাতিক ডাক ব্যবস্থার দক্ষতা এবং নির্বাচন কমিশনের সমন্বয় সক্ষমতার ওপর।
ইসি জানিয়েছে, ব্যালট ফেরত গ্রহণের শেষ সময়, গণনা পদ্ধতি, এবং প্রবাসী ভোটের ফলাফল সমন্বয়ের চূড়ান্ত প্রক্রিয়া নির্বাচন পরিচালনা বিধিমালা অনুযায়ী সম্পন্ন হবে এবং মূল ফলাফলের সঙ্গে তা সমন্বিতভাবে প্রকাশ করা হবে। ব্যালট বিতরণ, গ্রহণ, ও গণনা পর্যায়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রেরিত ব্যালটসমূহের বিতরণ-সময়সীমা ডাক সেবার দেশভেদে ভিন্ন হতে পারে বলে কমিশন পূর্বাভাস দিয়েছে।