বাংলাদেশ ডেস্ক
নৌ পরিবহন উপদেষ্টা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) ড. এম সাখাওয়াত হোসেন জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া ও নিহত ব্যক্তিদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। মঙ্গলবার (৬ জানুয়ারি) সচিবালয়ে উপদেষ্টা কার্যালয়ে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, ২০২৪ সালের জুলাই গণ–অভ্যুত্থানে যারা জীবন দিয়েছেন, তাদের রক্তের মর্যাদা যাতে কোনোভাবেই ক্ষুণ্ন না হয়, সে বিষয়ে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দায়বদ্ধতা বজায় রাখতে হবে।
উপদেষ্টা বলেন, ‘আগামীতে যে সরকারই দায়িত্বে আসুক, জুলাই–যোদ্ধাদের রক্তের প্রতি শ্রদ্ধা রাখতে হবে এবং এই আত্মত্যাগ বৃথা না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে।’ তিনি আরও বলেন, আন্দোলনের সময় নিহতদের স্মৃতি ও অবদান রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের অংশ হয়ে থাকবে এবং এই অবদানকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদায় সংরক্ষণ করা জরুরি।
২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের পটভূমি তুলে ধরে ড. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার আন্দোলন দমনে কঠোর অবস্থান নেয়। সরকারি হিসাব ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার তথ্যমতে, জুলাই–আগস্টের সহিংসতায় প্রায় ১,৪০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়। আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিবর্ষণের ঘটনাও ব্যাপক আলোচিত ছিল। উপদেষ্টা বলেন, এত বিপুলসংখ্যক প্রাণহানির পরও তৎকালীন সরকার নীতিগত অবস্থান থেকে সরে আসেনি; বরং ক্ষমতার ধারাবাহিকতা দীর্ঘায়িত করার কৌশল অনুসরণ করা হয়েছিল। তবে আন্দোলনে অংশ নেওয়া সাধারণ মানুষ, শিক্ষার্থী ও তরুণদের প্রতিরোধে সরকারের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হয়নি।
আন্দোলনের উত্তাল দিনগুলোর প্রসঙ্গে নৌ উপদেষ্টা বলেন, ২০২৪ সালের ৪ আগস্ট অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি একটি সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। ওই সংবাদ সম্মেলনে সামরিক বাহিনীকে জনতার ওপর গুলি না চালানোর অনুরোধ জানানো হয়। সেখানে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে নীতিগত আলোচনা হয় এবং সেনাবাহিনীকে অবৈধ নির্দেশ পালনে নিরুৎসাহিত করার কথা বলা হয়েছিল। পরবর্তী সময়ে ৫ আগস্টের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকার প্রধান দেশ ত্যাগ করেন। ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার গঠিত হলে ড. সাখাওয়াতকে নৌ পরিবহন ও শ্রম–কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব দেওয়া হয়।
উপদেষ্টা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি জুলাই আন্দোলনে আহতদের চিকিৎসা সহায়তা ও পুনর্বাসনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, চক্ষু হাসপাতাল এবং সম্মিলিত সামরিক হাসপাতাল (সিএমএইচ)–এ তিনি একাধিকবার আহতদের খোঁজ নিতে যান। এছাড়া চট্টগ্রাম বন্দরে, বিশেষ করে নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন বিভিন্ন দপ্তরে জুলাই–যোদ্ধাদের কর্মসংস্থানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে চট্টগ্রাম বন্দরসহ একাধিক স্থাপনায় আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের অগ্রাধিকার ভিত্তিতে চাকরির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের শহীদদের স্মৃতি সংরক্ষণে নেওয়া উদ্যোগের কথাও তুলে ধরেন নৌ উপদেষ্টা। তিনি জানান, শহীদ ওসমান হাদীর স্মৃতি রক্ষায় ঝালকাঠির নল সিটিতে একটি লঞ্চঘাটের নামকরণ করা হয়েছে ‘শহীদ ওসমান হাদী লঞ্চঘাট নল সিটি’। এছাড়া ভোলা জেলায় একটি নৌ–স্পিডবোটের নামকরণও ওসমান হাদীর নামে করা হয়েছে। উপদেষ্টা বলেন, ‘শহীদদের স্মৃতি ধারণ করে এমন স্থাপনার নামকরণ ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে এই আন্দোলনের ইতিহাস পৌঁছে দেওয়ার একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রয়াস।’
রাষ্ট্রীয় কাঠামোর স্থায়িত্ব এবং আন্দোলন–পরবর্তী প্রভাব বিশ্লেষণ করে উপদেষ্টা বলেন, দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক অস্থিরতা, প্রশাসনিক কাঠামোর ওপর আস্থাহীনতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার ভাঙন একটি রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বে প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে জুলাই–আগস্টের সহিংসতায় প্রশাসনিক স্তরে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল, তা পুনরুদ্ধারে অন্তর্বর্তী সরকার বিভিন্ন সংস্কারমূলক কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। তিনি বলেন, আন্দোলনের সময় সমাজের তরুণ অংশের প্রতি রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল, তা পরবর্তী সময়ে নীতিগত অবস্থান পরিবর্তনের মাধ্যমে প্রশমিত হয়েছে।
ড. সাখাওয়াত বলেন, তিনি দীর্ঘদিন ধরে নিরাপত্তা, রাজনীতি ও রাষ্ট্রীয় কাঠামো নিয়ে বিশ্লেষণমূলক লেখালেখি ও আলোচনা করেছেন। গত সরকারের সময়ে রাষ্ট্রীয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তার অংশগ্রহণ সীমিত ছিল; বিশেষ করে সামরিক বাহিনীর অনুষ্ঠানেও তাকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি—এ তথ্য তিনি নিজেই সাক্ষাৎকারে তুলে ধরেন। তবে অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর তার ভূমিকা ও অবস্থান নতুন প্রশাসনিক কাঠামোতে যুক্ত হয়েছে।
জুলাই আন্দোলনের অবদান সম্পর্কে নৌ উপদেষ্টা বলেন, ‘বাংলাদেশের ইতিহাসে জুলাই আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ গণ–অভ্যুত্থান হিসেবে বিবেচিত হবে এবং এর অংশীদারদের আত্মত্যাগের মর্যাদা রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ অব্যাহত থাকা প্রয়োজন।’