আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পাকিস্তান ও সৌদি আরব প্রায় ২ বিলিয়ন বা ২০০ কোটি ডলারের সৌদি ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান চুক্তিতে রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনা চালাচ্ছে। পাকিস্তানি দুটি সূত্রের বরাতে এ তথ্য জানা গেছে। তবে এই পুরো প্রতিরক্ষা চুক্তির মোট মূল্য প্রায় ৪ বিলিয়ন বা ৪০০ কোটি ডলার। গত বছরের পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তি স্বাক্ষরের কয়েক মাস পর এই আলোচনার সূচনা দুই দেশের সামরিক সহযোগিতাকে আরও গভীর করার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্সের খবরে বলা হয়েছে, আলোচনাটি এমন এক সময়ে সামনে এসেছে যখন পাকিস্তান তীব্র আর্থিক সংকটে রয়েছে। একই সময়ে সৌদি আরব মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা প্রতিশ্রুতির অনিশ্চয়তার প্রেক্ষাপটে তার নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব নতুনভাবে সাজাচ্ছে। দুই দেশই এখন পারস্পরিক প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের দিকে মনোনিবেশ করছে।
পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিটি গত সেপ্টেম্বর মাসে স্বাক্ষরিত হয়েছিল। চুক্তির আওতায় বলা হয়েছে, যেকোনো দেশের বিরুদ্ধে আক্রমণকে উভয়ের বিরুদ্ধে আক্রমণ হিসেবে গণ্য করা হবে। এ চুক্তির মাধ্যমে কয়েক দশক পুরোনো নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব আরও গভীর হয়েছে। পাকিস্তান দীর্ঘদিন ধরে সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা দিয়ে আসছে, যার মধ্যে রয়েছে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শমূলক মোতায়েন। সৌদি আরবও আর্থিক সংকটের সময় বারবার পাকিস্তানকে অর্থায়ন করেছে।
সূত্রের বরাতে জানা গেছে, আলোচনার মূল কেন্দ্রবিন্দু ছিল জেএফ-১৭ খান্ডার যুদ্ধবিমান সরবরাহ। এই হালকা যুদ্ধবিমানটি পাকিস্তান ও চীনের যৌথ উদ্যোগে উন্নয়ন করা হয়েছে এবং পাকিস্তানে উৎপাদিত হয়। আলোচনায় আরও কিছু বিকল্প থাকলেও জেএফ-১৭ ছিল প্রধান পছন্দ। পুরো চুক্তির মোট মূল্য ৪০০ কোটি ডলারের মধ্যে ঋণ রূপান্তরের বাইরের অংশ ২০০ কোটি ডলার বিভিন্ন সরঞ্জাম ক্রয়ের জন্য বরাদ্দ থাকবে।
সৌদি আরবে পাকিস্তানের বিমানবাহিনীর প্রধান জাহির আহমেদ বাবর সিধু দ্বিপক্ষীয় আলোচনায় অংশগ্রহণ করেছেন। আলোচনার অন্যতম বিষয় ছিল সামরিক সহযোগিতা এবং জেএফ-১৭ বিমান সরবরাহ। অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল ও বিশ্লেষক আমির মাসুদ বলেন, পাকিস্তান অন্তত ছয়টি দেশের সঙ্গে জেএফ-১৭ এবং অন্যান্য সামরিক সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক সিস্টেম ও অস্ত্রব্যবস্থা সরবরাহ নিয়ে আলোচনা বা চুক্তি চূড়ান্ত করেছে। সৌদি আরবও এ দেশের মধ্যে রয়েছে। তিনি জানান, জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান যুদ্ধক্ষেত্রে পরীক্ষিত এবং তুলনামূলকভাবে সাশ্রয়ী।
গত বছর ভারতের সঙ্গে মে মাসে সংঘটিত সংঘাতের সময় পাকিস্তান জেএফ-১৭ ব্যবহার করেছিল। ওই সংঘাত কয়েক দশকের মধ্যে দুই দেশের মধ্যে সবচেয়ে তীব্র লড়াই হিসেবে চিহ্নিত। এছাড়া পাকিস্তান সম্প্রতি লিবিয়ার ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারের একটি অস্ত্রচুক্তি করেছে। চুক্তিতে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ও প্রশিক্ষণ বিমান অন্তর্ভুক্ত।
পাকিস্তান জেএফ-১৭ বিক্রির ক্ষেত্রে বাংলাদেশসহ অন্যান্য দেশের সঙ্গে সম্ভাব্য আলোচনা চালাচ্ছে। এই উদ্যোগ দক্ষিণ এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে অস্ত্র সরবরাহের উচ্চাকাঙ্ক্ষা বিস্তৃত করার অংশ হিসেবে নেওয়া হয়েছে। পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ জানান, দেশের অস্ত্রশিল্পের সাফল্য অর্থনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ এবং আন্তর্জাতিক অর্ডারের মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রার প্রয়োজন কমাতে সহায়তা করতে পারে।
বর্তমানে পাকিস্তান আইএমএফের ৭০০ কোটি ডলারের একটি কর্মসূচির আওতায় রয়েছে। এর আগে ২০২৩ সালে ৩০০ কোটি ডলারের স্বল্পমেয়াদি চুক্তি দেশটিকে ঋণখেলাপি হওয়া থেকে রক্ষা করেছিল। সৌদি আরবসহ উপসাগরীয় মিত্রদের আর্থিক সহায়তা ও আমানত নবায়নের পর ইসলামাবাদ আইএমএফের এই সহায়তা নিশ্চিত করতে সক্ষম হয়।
এই আলোচনার মাধ্যমে পাকিস্তান ও সৌদি আরবের প্রতিরক্ষা সহযোগিতা এবং অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব আরও দৃঢ় হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। চুক্তি বাস্তবায়ন হলে দুই দেশের সামরিক সম্পর্ক ও অস্ত্র রপ্তানি সম্ভাবনা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।