আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান দেশের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট সমাধানের জন্য সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের কথা শুনতে প্রস্তুত থাকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তবে তিনি জনগণকে সতর্ক করে বলেছেন যে, দাঙ্গাকারী এবং সন্ত্রাসী উপাদানরা দেশের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করতে পারবে না।
পেজেশকিয়ান এই মন্তব্য করেছেন রোববার তেহরানের গ্র্যান্ড বাজারের ব্যবসায়ীদের দ্বারা শুরু হওয়া বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে। বাজার ব্যবসায়ীরা ইরানি রিয়ালের ব্যাপক মূল্য পতনের প্রতিবাদে দোকানপাট বন্ধ রাখার মাধ্যমে বিক্ষোভের সূচনা করেছিলেন, যা বর্তমানে তৃতীয় সপ্তাহে প্রবেশ করেছে। রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, সরকার দোকানদারদের উদ্বেগের কথা শুনেছে এবং তাদের সমস্যার সমাধানের জন্য কাজ করছে।
ইরানি প্রেসিডেন্ট দাবি করেন, দেশটির অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের মতো বিদেশি শক্তির চেষ্টা রয়েছে। তিনি বলেন, “জুন মাসে ইসরায়েলের ১২ দিনের যুদ্ধের সময় যারা আমাদের ক্ষতি করেছিল, তারা এখন অর্থনৈতিক অসন্তোষের আড়ালে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করছে।” পেজেশকিয়ান আরও উল্লেখ করেন, বিদেশ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত কিছু ব্যক্তি এবং ভাড়া সন্ত্রাসীরা দেশের ভেতরে নাশকতা চালাচ্ছে। তিনি রাশত শহরের একটি বাজারে হামলা এবং মসজিদে আগুন লাগানোর ঘটনাগুলোর দিকে ইঙ্গিত করেন।
প্রেসিডেন্ট পেজেশকিয়ান জনগণকে অনুরোধ করেন যেন তারা “দাঙ্গাকারীদের” উসকানিতে না আসে। তিনি বলেন, “দাঙ্গাকারীরা প্রতিবাদী জনতা নয়। আমরা সুশৃঙ্খল বিক্ষোভকারীদের কথা শুনছি এবং তাদের সমস্যা সমাধানের জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা করছি।”
বিশ্লেষকরা উল্লেখ করছেন, বর্তমান বিক্ষোভ মূলত অর্থনৈতিক অসন্তোষের প্রেক্ষাপটে শুরু হলেও তা ধীরে ধীরে সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। ২০২২-২০২৩ সালে মাহসা আমিনীর মৃত্যুর পর দেশব্যাপী শুরু হওয়া আন্দোলনের তুলনায় এটিই ইরানের সর্বশেষ এবং সবচেয়ে বড় বিক্ষোভ। ২২ বছর বয়সী মাহসা আমিনীকে কঠোর পোশাকবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেফতার করা হয়েছিল এবং পুলিশি হেফাজতে তার মৃত্যু ঘটে।
আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়াও লক্ষ্যণীয়। যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প রোববার বলেছেন, ইরানে চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষিতে ওয়াশিংটন দেশটিতে সামরিক হস্তক্ষেপসহ ‘কঠোর পদক্ষেপ’ গ্রহণের সম্ভাবনা বিবেচনা করছে। তিনি জানান, তাঁর সামরিক হুমকির পর ইরানের পক্ষ থেকে আলোচনার প্রস্তাব এসেছে এবং একটি বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে। তবে ট্রাম্প ইঙ্গিত দিয়েছেন যে, বৈঠকের আগে প্রয়োজন হলে যুক্তরাষ্ট্র পদক্ষেপ নিতে পারে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম সিএনএন জানিয়েছে, প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানে চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে বিভিন্ন সামরিক বিকল্পের কথা বিবেচনা করছেন। কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে জানানো হয়, ইরানি কর্তৃপক্ষ যদি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী শক্তি প্রয়োগ অব্যাহত রাখে, তবে তেহরানের বিরুদ্ধে সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণের সম্ভাবনা গুরুত্বসহকারে বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে হোয়াইট হাউসের অভ্যন্তরে কিছু কর্মকর্তা আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন যে, সরাসরি সামরিক হস্তক্ষেপ ইরানের জনগণকে সরকারের পক্ষে একত্রিত করতে পারে এবং প্রতিক্রিয়ার সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
এই পরিস্থিতিতে ইরানি প্রেসিডেন্ট এবং আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকেরা উভয়ই সতর্ক অবস্থান নেয়েছেন, যাতে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক অস্থিরতার পরিস্থিতি আরও জটিল না হয়।