আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে দেশটির বিক্ষুব্ধ জনতার প্রতি আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। একই সঙ্গে তিনি ইরানের জাতীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দখল নেওয়ার নির্দেশনা দেন এবং বিক্ষোভ দমনে জড়িতদের নাম নথিবদ্ধ করার আহ্বান জানান। ইরানের বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়নের প্রতিবাদ জানিয়ে তেহরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সব ধরনের বৈঠক স্থগিত করার ঘোষণাও দিয়েছেন তিনি।
মঙ্গলবার নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যাল অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এসব মন্তব্য করেন। পোস্টে তিনি ইরানের আন্দোলনরত জনগণকে ‘দেশপ্রেমিক’ আখ্যা দিয়ে বলেন, বিক্ষোভ-আন্দোলন অব্যাহত রাখতে এবং রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে নিতে হবে। একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, বিক্ষোভ দমনে জড়িত ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগুলো সহিংসতা ও নির্যাতনের সঙ্গে যুক্ত এবং ভবিষ্যতে তাদের এর ‘মূল্য দিতে হবে’।
প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর পক্ষ থেকে নির্বিচারে গুলি চালানো হচ্ছে। তিনি এই পরিস্থিতিকে ‘হত্যাযজ্ঞ’ হিসেবে বর্ণনা করে বলেন, যতদিন পর্যন্ত এই সহিংসতা বন্ধ না হবে, ততদিন তিনি ইরানের কোনো সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে বৈঠকে বসবেন না। ট্রুথ সোশ্যালের ওই পোস্টে তিনি আরও উল্লেখ করেন, ইরানের বিক্ষোভকারীদের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সহযোগিতা আসছে।
ইরানে সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন সামাজিক ও রাজনৈতিক দাবিকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। বিভিন্ন শহরে আন্দোলনে অংশ নেওয়া জনতার সঙ্গে নিরাপত্তা বাহিনীর সংঘর্ষের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এসব ঘটনায় হতাহতের তথ্য প্রকাশিত হলেও সরকারিভাবে নির্ভরযোগ্য ও পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান প্রকাশ করা হয়নি। ইরানের কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতোই বিক্ষোভকে ‘বিদেশি ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে কঠোর অবস্থানের কথা জানিয়ে আসছে।
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক টানাপোড়েন চলছে। পরমাণু কর্মসূচি, আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তার, মানবাধিকার পরিস্থিতিসহ একাধিক ইস্যুতে দুই দেশের সম্পর্ক উত্তপ্ত। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এর আগেও ইরানের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কঠোর মন্তব্য করেছেন এবং তেহরানের ওপর অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা জোরদার করেছেন। সাম্প্রতিক এই বক্তব্য সেই উত্তেজনাকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
আন্তর্জাতিক আইন ও কূটনৈতিক রীতিনীতির দৃষ্টিকোণ থেকে একটি দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক আন্দোলনে অন্য দেশের রাষ্ট্রপ্রধানের প্রকাশ্য সমর্থন সংবেদনশীল বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। ট্রাম্পের মন্তব্যকে ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে সরাসরি হস্তক্ষেপ হিসেবে দেখছে তেহরান। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার কূটনৈতিক সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অন্যদিকে, ইরানের বিক্ষোভকারীদের জন্য ‘সহযোগিতা আসছে’—এমন বক্তব্য আন্তর্জাতিক মহলে নানা প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। এই সহযোগিতা কূটনৈতিক, মানবিক না কি অন্য কোনো রূপে আসতে পারে, সে বিষয়ে স্পষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট। ফলে বিষয়টি নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আলোচনা ও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে ইরানের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সম্পর্কের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা আরও বেড়েছে। বিক্ষোভ দমন, কূটনৈতিক অবস্থান এবং আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ার ওপর নির্ভর করে এই পরিস্থিতি কোন দিকে মোড় নেয়, তা এখন পর্যবেক্ষণ করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।