রাজনীতি ডেস্ক
রাজধানী ঢাকাসহ দেশের সকল জেলা–মহানগর ও সাংগঠনিক ইউনিট থেকে আগামী তিন দিনের মধ্যে দলীয় শোক ব্যতীত অন্যান্য সব ব্যানার–পোস্টার সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নির্দেশনার আলোকে এই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। সদ্য প্রয়াত বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ সংক্রান্ত ব্যানার–পোস্টার আপাতত কয়েক দিন দৃশ্যমান থাকলেও রাজনৈতিক কর্মসূচি, প্রচারণা বা সাংগঠনিক কার্যক্রম সংশ্লিষ্ট অন্যান্য সকল ব্যানার–পোস্টার অপসারণ করা হবে বলে দলীয় সূত্র নিশ্চিত করেছে।
শুক্রবার (২ জানুয়ারি) সকাল ১০টায় নয়াপল্টনে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি এবং অঙ্গ–সহযোগী সংগঠন যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও ছাত্রদলের শীর্ষ নেতাদের অংশগ্রহণে এক সমন্বয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে উপস্থিত থেকে সাংগঠনিক নির্দেশনা প্রদান করেন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। বৈঠক শেষে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে থেকে ব্যানার–পোস্টার অপসারণ কার্যক্রমের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন তিনি।
উদ্বোধনী পর্বে রুহুল কবীর রিজভী সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে বলেন, “ব্যানার–পোস্টার রাজনৈতিক মতপ্রকাশ ও কর্মসূচি প্রচারের একটি স্বীকৃত মাধ্যম। তবে অপরিকল্পিতভাবে এসব স্থাপনের ফলে নগরীর নান্দনিকতা, সৌন্দর্য, পথচারী চলাচল ও নাগরিক শৃঙ্খলা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, যা কারো কাম্য নয়।” তিনি আরও উল্লেখ করেন, ব্যানার–পোস্টার স্থাপন বা অপসারণের ক্ষেত্রে নাগরিক অধিকার, জনপরিসরের শৃঙ্খলা ও নান্দনিকতা যাতে কোনোভাবেই ব্যাহত না হয়, সেই বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সুস্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন।
দলীয় এই উদ্যোগকে স্বেচ্ছাশ্রমভিত্তিক কার্যক্রম হিসেবে আখ্যা দিয়ে রিজভী বলেন, “ঢাকা মহানগর উত্তর ও দক্ষিণ বিএনপি, যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল এবং ছাত্রদলের নেতাকর্মীরা নিজেদের শ্রম ও সাংগঠনিক সমন্বয়ের মাধ্যমে ব্যানার–পোস্টার অপসারণ কার্যক্রম শুরু করেছেন। রাজনৈতিক কর্মসূচি শেষ হলে সংশ্লিষ্ট ব্যানার–পোস্টার নিজ উদ্যোগে অপসারণ করা উচিত—এই সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠাই আমাদের লক্ষ্য।” তিনি জানান, কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ঢাকা মহানগর থেকে শুরু হওয়া এই কার্যক্রম পর্যায়ক্রমে দেশের প্রতিটি সাংগঠনিক ইউনিটে বাস্তবায়িত হবে।
বৈঠক ও উদ্বোধনী কার্যক্রমে বিএনপি ও দলীয় অঙ্গসংগঠনের একাধিক শীর্ষ নেতা উপস্থিত ছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির আহ্বায়ক আমিনুল হক, সদস্যসচিব মোস্তফা জামান, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ বিএনপির সদস্যসচিব তানভীর আহমেদ রবীন, যুবদলের সভাপতি মোনায়েম মুন্না, সাংগঠনিক সম্পাদক কামরুজ্জামান জুয়েল, স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি এস এম জিলানী, সহসভাপতি ডা. জাহেদুল কবীর জাহিদ, ছাত্রদলের নেতা রাজু আহমেদ এবং ডা. তৌহিদুর রহমান আউয়ালসহ কেন্দ্রীয় ও মহানগর পর্যায়ের অন্যান্য দায়িত্বশীল নেতৃবৃন্দ।
বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে জানা গেছে, ব্যানার–পোস্টার অপসারণের এই সিদ্ধান্তের পেছনে একাধিক প্রাসঙ্গিক বিবেচনা কাজ করেছে। প্রথমত, রাজধানী ঢাকা বাংলাদেশের প্রশাসনিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। এই নগরীতে জনপরিসর ও পথব্যবস্থাপনার শৃঙ্খলা রক্ষা একটি গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক চাহিদা। ব্যানার–পোস্টারের অপরিকল্পিত বিস্তৃতি নগরীর ঐতিহ্য, পর্যটন–সম্ভাবনা ও জনপরিসর ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলে বলে দীর্ঘদিন ধরেই নগর–পরিকল্পনা বিশেষজ্ঞ ও নাগরিক সমাজ পর্যায়ে আলোচনা বিদ্যমান।
দ্বিতীয়ত, বিএনপি সাংগঠনিকভাবে জনসম্পৃক্ত রাজনৈতিক দল হিসেবে পরিচিত। দলটির বিভিন্ন কর্মসূচি, সমাবেশ, আলোচনা সভা, দোয়া মাহফিল, সাংগঠনিক সফর ও জাতীয় দিবস–কেন্দ্রীক কর্মসূচিতে ব্যানার–পোস্টার প্রচলিত প্রচার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশের প্রধান প্রধান নগরগুলোতে ব্যানার–পোস্টারের অতিরিক্ত উপস্থিতি জনদৃষ্টিতে অস্বস্তি সৃষ্টি করেছে। এই প্রেক্ষাপটে দলীয় পর্যায়ে প্রচারণা ও মতপ্রকাশের মাধ্যম ব্যবহারে একটি দায়িত্বশীল, শৃঙ্খলাবদ্ধ ও পরিবেশ–সচেতন সাংগঠনিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার প্রয়াস থেকেই ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানের এই নির্দেশনা দেওয়া হয়।
তৃতীয়ত, খালেদা জিয়ার মৃত্যুতে দলের সর্বস্তরে শোকের আবহ বিরাজ করছে। সেই শোক প্রকাশের ব্যানার–পোস্টারকে সম্মান দেখিয়ে তা আপাতত বহাল রাখলেও অন্য সকল ব্যানার–পোস্টার অপসারণের সিদ্ধান্ত রাজনৈতিক শিষ্টাচার, নগর–সৌন্দর্য, নাগরিক চলাচল ও জনপরিসরের নান্দনিকতা রক্ষায় একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক বার্তা বহন করছে।
বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, তিন দিনের সময়সীমা নির্ধারণ করা হলেও কার্যক্রমের বাস্তবায়ন পরিস্থিতি সাংগঠনিক ইউনিটগুলোর সক্ষমতা ও স্থানীয় ব্যবস্থাপনার সমন্বয়ের ওপর নির্ভর করবে। ব্যানার–পোস্টার অপসারণের ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনুমোদিত নীতিমালা ও স্থানীয় সিটি করপোরেশন/পৌরসভা/জেলা প্রশাসনের জনপরিসর ব্যবস্থাপনার প্রচলিত নিয়ম মেনে চলার বিষয়ে নেতাকর্মীদের মৌখিক ও লিখিতভাবে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রাজধানী ঢাকা থেকে এই কার্যক্রমের সূচনা একটি সাংগঠনিক দৃষ্টান্ত হিসেবে রাজনৈতিক মহলে আলোচিত হচ্ছে। দলীয় নেতৃবৃন্দ আশা প্রকাশ করেছেন, এই উদ্যোগ জনপরিসরের নান্দনিকতা রক্ষার পাশাপাশি রাজনৈতিক প্রচারণায় দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে এবং পরবর্তী সকল রাজনৈতিক কর্মসূচি ব্যবস্থাপনায় স্ব–উদ্যোগে ব্যানার–পোস্টার অপসারণের সাংগঠনিক সংস্কৃতি আরও দৃঢ় হবে।