রাজনীতি ডেস্ক
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বগুড়া-২ আসনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মাহমুদুর রহমান মান্নার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করা হয়েছে। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) দুপুরে বগুড়া জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে রিটার্নিং কর্মকর্তা আনুষ্ঠানিকভাবে এ সিদ্ধান্ত জানান। জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মান্না তাঁর দাখিল করা হলফনামার সঙ্গে সম্পদের বিবরণী সংক্রান্ত নির্ধারিত ফরম জমা দেননি। নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী প্রার্থীর সম্পদ ও দায়-দেনার পূর্ণাঙ্গ তথ্য জমা দেওয়া বাধ্যতামূলক। ওই ফরম দাখিলে ব্যত্যয় ও অসংগতির কারণে মনোনয়ন বাতিল করা হয়েছে বলে জানান জেলা রিটার্নিং কর্মকর্তা।
রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের পর মান্নার প্রার্থিতা আপাতত স্থগিত হলেও, নির্বাচন কমিশনের বিধান অনুযায়ী মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল করার সুযোগ রয়েছে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তিনি বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয়ে আপিল করতে পারবেন এবং আপিল নিষ্পত্তি সাপেক্ষে প্রার্থিতা পুনর্বহাল বা বাতিল বহাল রাখার সিদ্ধান্ত আসবে। মনোনয়ন বাতিলের বিষয়টি বগুড়া-২ আসনের রাজনৈতিক সমীকরণে নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে।
এর আগে এ আসনে মান্না বিএনপির মনোনয়ন পেয়েছেন—এমন তথ্য নির্বাচনী মাঠে প্রচারিত হলেও, প্রকৃতপক্ষে জোটভিত্তিক নির্বাচনী সমঝোতার অংশ হিসেবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক জোটের সমর্থনে নাগরিক ঐক্যের সভাপতি মান্নাকে বগুড়া-২ আসনে প্রার্থী হিসেবে মনোনীত করা হয়। বাংলাদেশে জোটগত নির্বাচন ব্যবস্থায় বড় রাজনৈতিক দলগুলো সমঝোতার ভিত্তিতে শরিক দল বা জোটসঙ্গীদের নির্দিষ্ট আসনে সমর্থন দিয়ে থাকে। সে প্রক্রিয়াতেই মান্নাকে বগুড়া-২ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য সমর্থন দেওয়া হয়, যা জাতীয় রাজনীতিতে জোট কৌশলের একটি পরিচিত চর্চা।
মনোনয়ন দাখিলের পর প্রার্থিতা যাচাই-বাছাইয়ের আগেই মান্নার নাম ঋণখেলাপির তালিকায় থাকায় তাঁর নির্বাচন অংশগ্রহণ নিয়ে আইনগত অনিশ্চয়তা তৈরি হয়। বাংলাদেশের নির্বাচন ব্যবস্থায় ঋণখেলাপি ব্যক্তিদের সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আইনগত বিধি-নিষেধ রয়েছে। তবে মান্নার ক্ষেত্রে ওই অনিশ্চয়তা কাটাতে আদালতে আইনি প্রক্রিয়া শুরু হয়। গত ২৯ ডিসেম্বর সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত একটি আদেশ দেন, যার মাধ্যমে মান্নার প্রার্থী হতে আইনগত বাধা অপসারিত হয়। আদালতের আদেশের পর তাঁর মনোনয়ন বৈধভাবে নির্বাচন কমিশনে গৃহীত হয় এবং প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতার পথ উন্মুক্ত হয়।
আদালতের সিদ্ধান্তের পর তাঁর প্রার্থিতা নিয়ে আইনগত জট কাটলেও, হলফনামার সম্পদ বিবরণী ফরম জমা না দেওয়ার কারণে এবার প্রশাসনিক যাচাই প্রক্রিয়ায় মনোনয়ন বাতিল হলো। নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রার্থীর ব্যক্তিগত ও আর্থিক তথ্যের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হলফনামা যাচাই প্রক্রিয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর মাধ্যমে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির আর্থিক স্বচ্ছতা, সম্ভাব্য স্বার্থের সংঘাত ও জবাবদিহিতা মূল্যায়নের প্রাথমিক ভিত্তি তৈরি হয়। সম্পদ বিবরণীর ফরম জমা না দেওয়ার বিষয়টি আইনি বাধা নয়, বরং প্রক্রিয়াগত ত্রুটি; ফলে আপিলে তা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে, যদি আপিল কর্তৃপক্ষ সন্তোষজনক ব্যাখ্যা ও নথি গ্রহণযোগ্য মনে করেন।
বগুড়া-২ আসনটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম আলোচিত নির্বাচনী এলাকা। এ আসনে অতীতে জাতীয় নির্বাচনে বড় দলগুলোর মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা দেখা গেছে। স্থানীয় অর্থনীতি মূলত কৃষি, ক্ষুদ্র বাণিজ্য, সেবা খাত ও রেমিট্যান্সনির্ভর। ফলে নির্বাচনী ইশতেহারে কর্মসংস্থান, কৃষিপণ্যের ন্যায্যমূল্য, সড়ক অবকাঠামো, নদীভাঙন রোধ, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন, এবং শিল্পায়নের মতো বিষয় বরাবরই গুরুত্ব পেয়ে থাকে। মান্নার প্রার্থিতা নিয়ে ধারাবাহিক অনিশ্চয়তা ও সর্বশেষ মনোনয়ন বাতিলের ঘটনা এ আসনে ভোটার ও রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী, মনোনয়ন বাতিলের বিরুদ্ধে আপিল নিষ্পত্তির জন্য সীমিত সময় বেঁধে দেওয়া থাকে, যাতে নির্বাচনের সামগ্রিক সময়সূচি ব্যাহত না হয়। সাধারণত আপিল শুনানি শেষে প্রার্থিতা পুনর্বহাল হলে প্রার্থী নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিতে পারেন, আর আপিল খারিজ হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থী আর প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারবেন না। মান্নার আপিলের সিদ্ধান্ত কী হবে—তা জানতে অপেক্ষা করতে হবে আপিল কর্তৃপক্ষের শুনানি ও রায়ের ওপর।
নির্বাচনের আগে প্রার্থিতা বাতিল, পুনর্বহাল বা আইনি বাধা অপসারণের মতো ঘটনাগুলো বাংলাদেশের নির্বাচন প্রক্রিয়ায় নতুন নয়। তবে প্রতিটি আসনের স্থানীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এর প্রভাব ভিন্ন মাত্রা পায়। বগুড়া-২ আসনে মান্নার মনোনয়ন বাতিল ও আপিলের সম্ভাবনা নির্বাচনী প্রতিদ্বন্দ্বিতা, জোট কৌশল, এবং প্রার্থীর নথি ব্যবস্থাপনার গুরুত্বকে পুনরায় সামনে এনেছে। আপিলের ফলাফল এ আসনের নির্বাচনী চিত্রে চূড়ান্ত প্রভাব ফেলবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।