রাজনীতি ডেস্ক
ফেনী, ২ জানুয়ারি ২০২৬ — ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের দায়ে ফেনী-৩ (সোনাগাজী–দাগনভূঞা) আসনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ও ছাত্রশিবিরের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ডা. ফখরুদ্দিন মানিককে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। শুক্রবার (২ জানুয়ারি) দুপুরে দাগনভূঞা উপজেলার মাতুভূঞা ইউনিয়নের উত্তর আলীপুর এলাকায় পরিচালিত এক অভিযানে এ জরিমানা আরোপ করা হয়। উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহিদুল আলম আদালত পরিচালনা ও অভিযানে নেতৃত্ব প্রদান করেন।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের কার্যক্রম ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী ডা. ফখরুদ্দিন মানিক মাতুভূঞা ইউনিয়নের উত্তর আলীপুর এলাকার বিবি ফাতেমা এতিমখানায় ‘অভিভাবক সমাবেশ’ আয়োজনের ঘোষণা দিয়ে সেখানে উপস্থিত হন। সমাবেশটি মূলত এতিমখানার শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের নিয়ে আয়োজনের কথা বলা হলেও, বাস্তবে ওই সমাবেশে নির্বাচনী প্রচার-সংক্রান্ত কার্যক্রম পরিচালনার প্রমাণ পায় ভ্রাম্যমাণ আদালত। স্থানীয় প্রশাসনের কাছে সমাবেশটিকে সামাজিক বা শিক্ষামূলক অনুষ্ঠান হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও, খবর পেয়ে ভ্রাম্যমাণ আদালত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে। অভিযানে আচরণবিধিমালা, ২০২৫-এর বিধি-১৮ লঙ্ঘনের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া গেলে প্রার্থীর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক বিচার কার্যক্রম শুরু করা হয় এবং ২০ হাজার টাকা জরিমানা আরোপ করা হয়।
বিধি-১৮ অনুযায়ী, কোনো রাজনৈতিক দল, প্রার্থী বা তার পক্ষে কোনো ব্যক্তি নির্বাচনী প্রচারের উদ্দেশ্যে ধর্মীয়, শিক্ষামূলক, দাতব্য বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সমাবেশ, অনুষ্ঠান বা কর্মসূচিকে ব্যবহার করতে পারবে না। এতিমখানা, মাদ্রাসা, বিদ্যালয়, মসজিদ বা উপাসনালয়সহ দাতব্য প্রতিষ্ঠানসমূহকে নির্বাচনী প্রচারের প্ল্যাটফর্ম হিসেবে ব্যবহার আচরণবিধির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হয়। একই বিধিতে আরও বলা আছে, এই ধরনের প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা, সামাজিক মর্যাদা ও জনআস্থার সুরক্ষা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব, যাতে নির্বাচন প্রক্রিয়া কোনো নির্দিষ্ট পক্ষের সুবিধা লাভের মাধ্যমে প্রশ্নবিদ্ধ না হয়। এ বিধি লঙ্ঘনের কারণে ভ্রাম্যমাণ আদালত প্রার্থীকে জরিমানা করে এবং জরিমানার অর্থ প্রার্থীর প্রতিনিধি তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধ করেন।
অভিযানের পর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট শাহিদুল আলম সাংবাদিকদের জানান, সমাবেশটি অভিভাবক সমাবেশের নামে আয়োজন করা হলেও, সেখানে নির্বাচনী প্রচার কার্যক্রম পরিচালনার প্রমাণ পাওয়া গেছে। আদালত পরিচালনার সময় সংগৃহীত ভিডিও ফুটেজে প্রার্থী ও তার পক্ষে উপস্থিত ব্যক্তিদের নির্বাচনী বক্তব্য, প্রচারমূলক স্লোগান এবং প্রচারণা-সংক্রান্ত আলাপচারিতার চিত্র স্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। সমাবেশে উপস্থিত অভিভাবক বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে যে ব্যাখ্যা প্রদান করা হয়, তাতে অভিভাবক সমাবেশ আয়োজনের কোনো বাস্তবভিত্তিক বা প্রামাণ্য তথ্য পাওয়া যায়নি। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, ‘‘অভিভাবক সমাবেশের নাম ব্যবহার করে অনুষ্ঠানটিকে সামাজিক কর্মসূচি হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করা হলেও, এর কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। আচরণবিধি লঙ্ঘনের প্রমাণ মিলেছে, ফলে জরিমানা আরোপ করা হয়েছে। জরিমানার অর্থ প্রার্থীর প্রতিনিধি পরিশোধ করেছেন।’’
ফেনী-৩ আসনটি সোনাগাজী ও দাগনভূঞা উপজেলা নিয়ে গঠিত। এ আসনে নির্বাচনী প্রচার, জনসংযোগ, প্রার্থী সমাবেশ ও নির্বাচনী কার্যক্রম ইতোমধ্যে ব্যাপকভাবে দৃশ্যমান। আসনটিতে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক দলসমূহের মধ্যে প্রচার কার্যক্রমে প্রতিযোগিতামূলক পরিস্থিতি বিদ্যমান। নির্বাচনী আচরণবিধি প্রণয়ন করা হয়েছে মূলত নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা, সমান সুযোগ, নিরপেক্ষ পরিবেশ, সহিংসতা প্রতিরোধ এবং রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের রাজনৈতিক অপব্যবহার রোধ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে। আচরণবিধি বাস্তবায়নে নির্বাচন কমিশন, জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর পাশাপাশি নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে ভ্রাম্যমাণ আদালতও সক্রিয় ভূমিকা পালন করছে।
বাংলাদেশে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের ঘটনায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে জরিমানা আরোপ নতুন কোনো বিষয় নয়; তবে নির্বাচনী প্রচারে দাতব্য বা সামাজিক প্রতিষ্ঠান ব্যবহারের প্রবণতা নিয়ে বিভিন্ন নির্বাচনে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। বিশেষত নির্বাচনী সময়ে এতিমখানা, মাদ্রাসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে সমাবেশ আয়োজনের নামে প্রচারণা চালানোর চেষ্টা আচরণবিধি প্রয়োগের ক্ষেত্রে অন্যতম স্পর্শকাতর বিষয় হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রশাসন ও নির্বাচন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মনে করে, এ ধরনের লঙ্ঘন রাজনৈতিক দল ও প্রার্থীর জন্য অল্প অঙ্কের আর্থিক দণ্ডের বিষয় হলেও, তা নির্বাচনী পরিবেশে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করে যে, রাষ্ট্রীয় বা সামাজিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা ক্ষুণ্ন হয়— এমন কার্যক্রমের ক্ষেত্রে প্রশাসন শূন্য সহনশীলতা নীতি অনুসরণ করছে।
এ ঘটনায় জরিমানার অর্থ পরিশোধের মাধ্যমে আদালতের আদেশ প্রতিপালিত হলেও, স্থানীয় প্রশাসন জানায় যে, নির্বাচনী আচরণবিধি মনিটরিং ও প্রয়োগ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের লঙ্ঘন প্রতিরোধে আরও নজরদারি জোরদার করা হবে। নির্বাচন কমিশনের আচরণবিধি প্রয়োগ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে ভ্রাম্যমাণ আদালতের এ অভিযানকে নির্বাচনী পরিবেশের ভারসাম্য ও প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা সুরক্ষার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।