সারাদেশ ডেস্ক
হবিগঞ্জের শায়েস্তাগঞ্জ উপজেলায় এক অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ১৩টি পরিবারের অন্তত ১৫টি বসতঘর সম্পূর্ণ পুড়ে গেছে। শুক্রবার (০২ জানুয়ারি) রাতে উপজেলার নুরপুর ইউনিয়নের শ্রীরামপুর গ্রামের শ্রীরামপুর ও সংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে। প্রাথমিকভাবে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ২৭ লাখ টাকা বলে ধারণা করা হলেও, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর আর্থসামাজিক প্রভাব বিবেচনায় প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
স্থানীয় প্রশাসন, প্রত্যক্ষদর্শী ও ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, রাত আনুমানিক ৭টার দিকে গ্রামের সজিব মিয়া ও রেনু মিয়ার বসতবাড়ির রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত ঘটে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। রান্নাঘরে ব্যবহৃত চুলা, গ্যাস সিলিন্ডার অথবা জ্বালানি কাঠ থেকে আগুনের উৎপত্তি হতে পারে—এমন অনুমান করা হলেও সুনির্দিষ্ট কারণ নিশ্চিত হতে তদন্ত চলমান রয়েছে। আগুনের সূত্রপাতের পরপরই তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। গ্রামের ঘরগুলো অধিকাংশই টিন, কাঠ, বাঁশ ও দাহ্য নির্মাণসামগ্রী দিয়ে তৈরি হওয়ায় অগ্নিশিখা কয়েক মিনিটের মধ্যেই ভয়ংকর রূপ ধারণ করে এবং ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বিস্তৃত হয়। বাতাসের প্রবাহ ও ঘরগুলোর ঘন বিন্যাস আগুনের বিস্তারে সহায়ক ভূমিকা পালন করে।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ঘর থেকে বের হয়ে জীবন রক্ষায় মানুষ ছোটাছুটি শুরু করেন। আগুনের তীব্রতা এত বেশি ছিল যে, অনেকেই ঘরের মালামাল বের করার সুযোগ পাননি। আগুনে ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলোর আসবাবপত্র, ইলেকট্রনিক সামগ্রী, নগদ অর্থ, সঞ্চয়পত্র, শিক্ষার্থীদের বই, প্রয়োজনীয় নথিপত্র, কাপড়, রান্নার সরঞ্জামসহ প্রায় সব সম্পদ ভস্মীভূত হয়েছে। ঘরের ভেতরে থাকা খাদ্যশস্য, শীতবস্ত্র, কৃষি উপকরণ ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের পণ্যও পুড়ে গেছে। ক্ষতিগ্রস্ত ১৩ পরিবারের মধ্যে দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষিশ্রমিক, রিকশাচালক ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত শ্রেণির মানুষ বেশি রয়েছেন, যাদের সঞ্চয় সীমিত এবং আয়ের উৎস অনিয়মিত। ফলে এ অগ্নিকাণ্ড তাদের জীবিকা ও পুনর্বাসনের সক্ষমতাকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে।
খবর পেয়ে শায়েস্তাগঞ্জ ফায়ার সার্ভিসের দুটি ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে আগুন নেভানোর কাজ শুরু করে। স্থানীয়দের সহযোগিতায় ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা আগুন নিয়ন্ত্রণে সর্বাত্মক চেষ্টা চালান। পানির উৎস সংকট, সংকীর্ণ রাস্তা এবং দাহ্য নির্মাণ কাঠামোর কারণে আগুন নেভানোর কাজ ছিল অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং। ফায়ার সার্ভিসের দীর্ঘ প্রচেষ্টার পর রাত আনুমানিক ৮টা ৩০ মিনিটে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। আগুন নিয়ন্ত্রণে এলেও ততক্ষণে ১৫টি ঘর সম্পূর্ণ ভস্মীভূত হয়ে যায় এবং আরও কয়েকটি ঘর আংশিক ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
ঘটনার পরপরই উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রণয়নের কাজ শুরু করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়, ইউনিয়ন পরিষদ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি ক্ষয়ক্ষতির প্রাথমিক মূল্যায়ন সম্পন্ন করে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো বর্তমানে খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করছেন। ঘরবাড়ি হারিয়ে শীতের মধ্যে তারা মানবিক সংকটে পড়েছেন। তাৎক্ষণিক আশ্রয়, খাদ্য, নিরাপদ পানি, শীতবস্ত্র ও পুনর্বাসন সহায়তা তাদের জন্য জরুরি হয়ে উঠেছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রাথমিকভাবে শুকনো খাবার ও শীতবস্ত্র বিতরণের প্রস্তুতি নেওয়া হলেও, দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন পরিকল্পনা প্রণয়ন প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
শায়েস্তাগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের স্টেশন অফিসার আরিফুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে বলেন, “আগুনের প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলমান রয়েছে। প্রাথমিকভাবে রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে তদন্ত শেষে সুনির্দিষ্ট কারণ জানা যাবে।” তিনি আরও জানান, অগ্নিকাণ্ডের সময় গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের কোনো আনুষ্ঠানিক তথ্য পাওয়া না গেলেও রান্নাঘরে দাহ্য পদার্থ থাকার কারণে আগুন দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে।
এ ধরনের অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ঘরবাড়ি হারানোর পাশাপাশি পরিবারগুলোর সামাজিক নিরাপত্তা, শিক্ষার্থীদের শিক্ষা কার্যক্রম, নারীদের স্বাস্থ্যসেবা, শিশুদের পুষ্টি, এবং কর্মক্ষম মানুষের জীবিকা পুনরুদ্ধার কার্যক্রম দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতির ঝুঁকি তৈরি করে। ঘরবাড়ি হারানো পরিবারগুলোর অনেকেই জাতীয় পরিচয়পত্র, জমির দলিল, ব্যাংক বই ও সঞ্চয়ের নথি হারিয়েছেন, যা ভবিষ্যতে সরকারি সহায়তা প্রাপ্তি, আর্থিক লেনদেন ও আইনি প্রক্রিয়ায় জটিলতা সৃষ্টি করতে পারে। দুর্যোগ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জরুরি মানবিক সহায়তার পাশাপাশি নথিপত্র পুনরুদ্ধার, শিক্ষার্থীদের জন্য শিক্ষা উপকরণ, মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, এবং ক্ষুদ্র ব্যবসা পুনরায় চালুর জন্য আর্থিক সহায়তা ও সহজ শর্তে ঋণপ্রাপ্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা জানান, গ্রামাঞ্চলে অধিকাংশ ঘরে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থা, নিরাপদ রান্নাঘর কাঠামো, বৈদ্যুতিক তারের সুরক্ষা মান এবং সচেতনতার ঘাটতি অগ্নিকাণ্ডের ঝুঁকি বাড়ায়। তাই পুনর্বাসনের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ ঝুঁকি কমাতে নিরাপদ রান্নাঘর, অগ্নিনির্বাপণ সচেতনতা প্রশিক্ষণ, এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রাথমিক আগুন মোকাবিলার সরঞ্জাম নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পুনর্বাসন সহায়তায় জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির মাধ্যমে বরাদ্দ চাওয়া হবে এবং ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রাথমিক সহায়তা বিতরণের পর পুনর্বাসন কার্যক্রম শুরু করা হবে। বর্তমানে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করা, মানবিক সহায়তা দ্রুত পৌঁছানো এবং প্রয়োজনীয় নথি পুনঃপ্রাপ্তির প্রক্রিয়া সহজীকরণই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।