রাজনীতি ডেস্ক
নবগঠিত রাজনৈতিক দল জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) সম্প্রতি অভ্যন্তরীণ সংকট ও শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগের মুখে পড়েছে। দলটি জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা করার পরিপ্রেক্ষিতে কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক পর্যায়ের একাধিক শীর্ষ নেতা পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগের এই ধারা এনসিপির রাজনৈতিক কার্যক্রম ও সংগঠন কাঠামোর ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
পদত্যাগের প্রাথমিক ধারা শুরু হয় দলীয় সিদ্ধান্তে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট গঠনের পর। এর পরিপ্রেক্ষিতে এনসিপির কেন্দ্রীয় শীর্ষ নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ বৃদ্ধি পায় এবং পদত্যাগের সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পেতে থাকে। দলটির প্রতিষ্ঠাতা সদস্য ও মিডিয়া সেলের প্রধান মুশফিক উস সালেহীন, কেন্দ্রীয় যুগ্ম মুখ্য সমন্বয়ক খান মুহাম্মদ মুরসালীনসহ অন্তত ১৪ জন কেন্দ্রীয় নেতা ইতোমধ্যে পদত্যাগ করেছেন। পদত্যাগ না করা নেতারাও দলে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ছেন।
এনসিপি নেতাদের মধ্যে চলমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে দলের প্রধান নাহিদ ইসলামের হলফনামায় উল্লেখিত আয়ের তথ্যও রাজনৈতিক আলোচনা উসকে দিয়েছে। পদত্যাগকারীরা উল্লেখ করেছেন, দলটি জুলাই ২০২৩-এর ছাত্র-জনতা অভ্যুত্থান এবং শহীদদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে গঠিত হওয়া সত্ত্বেও বর্তমানে আদর্শ ও উদ্দেশ্যের ক্ষেত্রে ভিন্নমুখী সিদ্ধান্ত নিচ্ছে। বিশেষত, জামায়াতের সঙ্গে নির্বাচনি সমঝোতা এবং জোটে যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্তকে দলটির নতুন ধারার রাজনীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক মনে করছেন অনেক নেতা।
জুলাই অভ্যুত্থানের শহীদ পরিবার ও আহতরা এনসিপির ভেতরে চলমান ভাঙন এবং পদত্যাগের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। শহীদ ফারহান ফাইয়াজের পিতা শহিদুল ইসলাম বলেন, “দলটি যেভাবে ভাঙনের মুখোমুখি হচ্ছে, তা জুলাই আন্দোলনের প্রতি আমাদের প্রত্যাশা এবং আশা ক্ষুণ্ণ করছে। পরিচিত মুখগুলো পদত্যাগ করছে, যারা আগে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিল।”
পদত্যাগকারীদের মধ্যে ডা. তাসনিম জারা ও তার স্বামী খালেদ সাইফুল্লাহ উল্লেখযোগ্য। ডা. তাসনিম জারা ২৮ ডিসেম্বর জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্য সচিব পদ থেকে পদত্যাগ করেন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে ঢাকা-৯ আসনে নির্বাচন করছেন। খালেদ সাইফুল্লাহ এনসিপির পলিসি ও রিসার্চ উইং-এর প্রধান হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছিলেন। পদত্যাগের পর উভয়েই দলের ভেতরের অসন্তোষ এবং নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রক্রিয়ার ওপর প্রশ্ন তোলেন।
এনসিপির শীর্ষ নেতৃত্বের পদত্যাগে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলেন, দলটির জন্য এটি একটি বড় ধরনের ক্ষতি। বিশেষ করে নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে গঠিত দলটির জন্য শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ সংগঠন ও নির্বাচনি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে নাজুক পরিস্থিতি সৃষ্টি করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সাব্বির আহমেদ উল্লেখ করেন, “নতুন রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য শীর্ষ নেতাদের স্থিতিশীলতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এনসিপি থেকে নেতাদের পদত্যাগ এবং দলে ভাঙন নতুন ধারার রাজনীতির উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।”
পদত্যাগের প্রেক্ষাপটে দলের কিছু নেতার অভিযোগ, জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার বিষয়ে কেন্দ্রীয় দুই নেতার ভূমিকা সবচেয়ে প্রভাবশালী ছিল। তারা অন্য শীর্ষ নেতাদের উপেক্ষা করে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছেন। এই কারণে অনেক নেতা ব্যক্তিগত রাজনৈতিক বিশ্বাস ও দায়বদ্ধতার জায়গা থেকে দল থেকে সরে দাঁড়াচ্ছেন অথবা পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন।
এনসিপি থেকে পদত্যাগের এই প্রবণতা দলের আঞ্চলিক নেতাদেরও ছুঁয়ে ফেলেছে। বিভিন্ন জেলা ও বিভাগীয় শহরের শীর্ষ নেতারা দলীয় কার্যক্রম থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিয়েছেন। পাশাপাশি, নির্বাচনে ঘোষিত বা সম্ভাব্য একাধিক প্রার্থীও পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই পরিস্থিতি এনসিপির নির্বাচনি কার্যক্রম ও দলের ভেতরের কাঠামোর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারে।
এভাবে, রাজনৈতিকভাবে নবগঠিত এনসিপি বর্তমানে অভ্যন্তরীণ ভাঙন, শীর্ষ নেতাদের পদত্যাগ এবং নিষ্ক্রিয়তার মধ্য দিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ সংকটের মুখোমুখি। দলটির ভবিষ্যৎ রাজনীতি, সংগঠন কাঠামো ও নির্বাচনি প্রস্তুতির ওপর এই সংকটের প্রভাব কেমন হবে তা সময়ের সঙ্গে পরিষ্কার হবে।