খেলাধূলা ডেস্ক
মঙ্গলবার মধ্যরাতে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডকে (বিসিবি) আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি) আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, আসন্ন আইসিসি টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের মাটিতেই বাংলাদেশ দলকে খেলতে হবে। এ তথ্য প্রথমে আন্তর্জাতিক একটি ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইটে প্রকাশিত হলে, বুধবার দুপুরে বিসিবি তা ‘গুজব’ আখ্যা দিয়ে নাকচ করে। তবে বিকালে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুলের সঙ্গে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের জানান, নিরাপত্তা ইস্যুতে ভারতের ভেন্যুতে না যাওয়ার সিদ্ধান্তে বিসিবি অটল রয়েছে এবং অধিকার রক্ষায় তারা আইসিসিকে নিজেদের অবস্থান ব্যাখ্যা করবে।
বৈঠক শেষে বিসিবি সভাপতি আমিনুল ইসলাম বুলবুল বলেন, ‘আমরা উপযুক্ত কারণ নিয়ে কথা বলছি। এতগুলো বিশ্বকাপ খেলেছি, কখনো এ ধরনের নিরাপত্তা শঙ্কার কথা বলিনি।’ তিনি জানান, শুধু ক্রিকেটারদের নিরাপত্তা নয়, টুর্নামেন্ট কাভার করতে যাওয়া সাংবাদিক, দর্শক, সমর্থক ও স্পনসরদের মতো বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বিসিবির একার পক্ষে সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের নির্দেশনা ও নীতিগত অবস্থান জানতে উপদেষ্টা পরিষদের সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। বুলবুলের ভাষ্যে, ‘আমাদের খেলোয়াড়দের নিরাপত্তা দেওয়ার উপায় আছে, কিন্তু বাইরে যে বড় জনগোষ্ঠী আছে—তাদের নিরাপত্তা বোর্ডের একার পক্ষে দেওয়া সম্ভব নয়। এজন্য সরকারের নির্দেশনা নিচ্ছি।’
তিনি আরও উল্লেখ করেন, পূর্বে নিরাপত্তার কারণে আইসিসির বড় টুর্নামেন্টে ‘হাইব্রিড ভেন্যু মডেল’ প্রয়োগের নজির রয়েছে। ২০২৩ ওয়ানডে বিশ্বকাপে পাকিস্তানের নিরাপত্তা শঙ্কার প্রেক্ষাপটে ম্যাচ সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ বিকল্প ভেন্যুতে আয়োজন করা হয়, যা ‘হাইব্রিড বিশ্বকাপ’ নামে পরিচিতি পায়। আইসিসির চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি ও এশিয়া কাপেও রাজনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত কারণে ভেন্যু পরিবর্তন, আংশিক নিরপেক্ষ মাঠ ব্যবহার এবং বিকল্প দেশে ম্যাচ আয়োজনের ইতিহাস রয়েছে। নিরাপত্তা–কেন্দ্রিক সিদ্ধান্তের এসব উদাহরণ টুর্নামেন্টের অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর কূটনৈতিক, প্রশাসনিক ও লজিস্টিক বাস্তবতার সঙ্গে সমন্বয় করে নেওয়া হয়। বিসিবি সভাপতির বক্তব্য অনুযায়ী, আইসিসিকে বাংলাদেশের নিরাপত্তা উদ্বেগ ব্যাখ্যা করে বিকল্প সমাধানের যৌক্তিকতা তুলে ধরা হবে।
এর আগে বিশ্বকাপে বাংলাদেশের ম্যাচ শ্রীলঙ্কায় আয়োজনের সম্ভাবনার খবর ছড়িয়ে পড়লেও, বিসিবি তা ‘প্রোপাগান্ডা ও ভুয়া খবর’ বলে উড়িয়ে দেয়। বুলবুল জানান, আইসিসির সঙ্গে তাদের প্রাথমিক যোগাযোগ হয়েছে, যেখানে আইসিসি বাংলাদেশের কাছে নির্দিষ্ট নিরাপত্তা উদ্বেগ ও ইস্যুগুলো লিখিতভাবে জানতে চেয়েছে। বিসিবি শিগগিরই তা লিখিত আকারে আইসিসির কাছে পাঠাবে। ‘এ ধরনের কোনো কথাই হয়নি যে আমরা শ্রীলঙ্কায় খেলব—এটি ভুয়া খবর,’ যোগ করেন তিনি।
অন্যদিকে, বিসিবি সভাপতির সঙ্গে বৈঠক শেষে যুব ও ক্রীড়া উপদেষ্টা ড. আসিফ নজরুল বলেন, ‘ভারতে নিরাপদে খেলার মতো পরিস্থিতি নেই। বাংলাদেশের মর্যাদা, নিরাপত্তা ও অংশগ্রহণের প্রশ্নে আমরা কোনো আপস করব না। আরেকটি যে আয়োজক দেশ আছে, শ্রীলঙ্কা—সেখানেও খেলতে চাই।’ তার বক্তব্যে স্পষ্ট করা হয়, সরকার ক্রিকেট খেলা ও বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ অব্যাহত রাখার পক্ষে, তবে তা অবশ্যই এমন ভেন্যুতে যেখানে নিরাপত্তা ঝুঁকি গ্রহণযোগ্য মাত্রায় নিয়ন্ত্রিত। উপদেষ্টার বক্তব্যে ক্রিকেট–সংশ্লিষ্ট বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নিরাপত্তা এবং দেশের মর্যাদার বিষয়টি রাষ্ট্রীয় নীতিগত অবস্থানের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আইসিসি সাধারণত অংশগ্রহণকারী দেশগুলোর নিরাপত্তা উদ্বেগ আমলে নিয়ে ‘ভেন্যু রিস্ক অ্যাসেসমেন্ট’, স্থানীয় আইন–শৃঙ্খলা বাহিনীর সক্ষমতা, সরকারি নিরাপত্তা নিশ্চয়তা, ভ্রমণ–ঝুঁকি পর্যালোচনা, ইভেন্ট সিকিউরিটি ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান, ইন্টেলিজেন্স–শেয়ারিং ব্যবস্থা, ভেন্যু–নিরাপত্তা সার্টিফিকেশন, এবং কূটনৈতিক ও লজিস্টিক সমন্বয় বিবেচনায় সিদ্ধান্ত নেয়। বিসিবির পক্ষ থেকে আইসিসির কাছে যে ইস্যুগুলো পাঠানো হবে, সেগুলো এই কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উপস্থাপন করা হলে আইসিসি বিকল্প ভেন্যু বা হাইব্রিড মডেলের মতো সমাধান বিবেচনায় নিতে পারে।
বিসিবি সভাপতির বক্তব্য অনুযায়ী, বিশ্বকাপে ভারতের ভেন্যু পরিবর্তনের দাবি মেনে না নিলে বাংলাদেশের অবস্থান অপরিবর্তিত থাকবে। তবে আইসিসির সঙ্গে আলোচনায় সমঝোতা না হলে সম্ভাব্য পরিণতি—যেমন অংশগ্রহণ থেকে বিরত থাকার ক্রীড়া–কূটনৈতিক প্রভাব, টুর্নামেন্টের সূচি পুনর্বিন্যাস, গ্রুপ সমীকরণে পরিবর্তন, সম্প্রচার ও বাণিজ্যিক অংশীদারত্বে সমন্বয়, সমর্থকদের ভ্রমণ পরিকল্পনায় প্রভাব এবং আইসিসি–সদস্য সম্পর্কের প্রশাসনিক জটিলতা—এসব বিষয়ে বিসিবি বা সরকার কোনো চূড়ান্ত ঘোষণা দেয়নি।
প্রতিবেদন বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশ বিশ্বকাপে খেলবে কি না—সেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নির্ভর করছে আইসিসির কাছে পাঠানো বিসিবির লিখিত ব্যাখ্যা এবং তার পর আইসিসির আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়ার ওপর। বিসিবি জানিয়েছে, বিশ্বকাপের জন্য তাদের প্রস্তুতিতে কোনো ঘাটতি নেই এবং তারা নিজেদের সিদ্ধান্তে অনড়। লিখিত ব্যাখ্যা পাওয়ার পর আইসিসি পরবর্তী করণীয় ও ভেন্যু–সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত জানাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।