জাতীয় ডেস্ক
ঢাকা, ৯ জানুয়ারি ২০২৬: গুজব ও অপতথ্য প্রতিরোধে গণমাধ্যমকর্মীদের ভূমিকা অপরিহার্য উল্লেখ করে আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে গুজব রোধে সাংবাদিকদের সহায়তা চেয়েছেন তথ্যসচিব মাহবুবা ফারজানা। শুক্রবার (৯ জানুয়ারি) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি (ডিআরইউ)-এর সদস্যদের অংশগ্রহণে আয়োজিত নির্বাচন সাংবাদিকতা বিষয়ক কর্মশালায় তিনি এ আহ্বান জানান। দুই দিনের এ প্রশিক্ষণ কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ (পিআইবি)-এর সেমিনার কক্ষে অনুষ্ঠিত হয়।
উদ্বোধনী বক্তব্যে তথ্যসচিব বলেন, নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং ভুল তথ্য প্রতিরোধে গণমাধ্যমের ভূমিকা রাষ্ট্রীয় কাঠামোকে সহায়তা করে। গুজব ও বিভ্রান্তিমূলক তথ্য সামাজিক স্থিতিশীলতা, ভোটারের আস্থা এবং নির্বাচন ব্যবস্থাপনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে—এমন প্রেক্ষাপটে সংবাদকর্মীদের তথ্য যাচাই, দ্রুত প্রতিক্রিয়া এবং পেশাদার সংবাদ পরিবেশনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
কর্মশালায় তথ্যসচিব গণভোট ও নির্বাচনকেন্দ্রিক অপতথ্য প্রতিরোধে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, ‘ভোট প্রক্রিয়া ও গণভোট সম্পর্কে সঠিক তথ্য প্রচারে সাংবাদিকদের লেখনী ও মাল্টিমিডিয়া সক্ষমতা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’ তিনি জানান, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে দেশব্যাপী ভোটারদের অবহিত করতে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে মাল্টিমিডিয়া-নির্ভর প্রচার কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর আওতায় ৬৪ জেলায় ৪৯৫টি উপজেলায় ‘ভোটালাপ উঠান বৈঠক’ ও ‘টেন মিনিট ব্রিফিং’ শীর্ষক কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। এসব উদ্যোগে প্রান্তিক পর্যায়ের জনগোষ্ঠী, নারী, তরুণ ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভোটারদের কাছে ভোট ও গণভোটের নিয়ম-সংক্রান্ত তথ্য পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে।
তথ্যসচিব আরও বলেন, মোবাইলফোন-ভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও সরল নির্দেশনা ব্যবহার করে ভোটারদের ভোট প্রদানের নিয়ম শেখানো হচ্ছে। ডিজিটাল বিভাজন কমাতে স্থানীয় ভাষা ও সহজবোধ্য উপস্থাপনার মাধ্যমে ভোট প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করা হচ্ছে, যাতে প্রযুক্তি-অপরিচিত জনগোষ্ঠীও প্রক্রিয়াটি বুঝতে পারে। নির্বাচনকেন্দ্রিক অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতা বিবেচনায় নিয়ে মাঠপর্যায়ের প্রচার কার্যক্রমে দ্রুত তথ্য সংশোধন ও ভ্রান্ত তথ্য নিরসনে তাৎক্ষণিক ব্রিফিং কৌশল ব্যবহার করা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে তথ্যসচিব তরুণ, নারী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াতে সরকারের নীতিগত ও যোগাযোগ কৌশল সম্পর্কেও বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, নির্বাচনে অন্তর্ভুক্তিমূলক অংশগ্রহণ গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি শক্তিশালী করে। ভোটার অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে গণমাধ্যমের সঠিক ও নিরপেক্ষ তথ্যপ্রবাহ সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবেশকে স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি, গণভোট ও নির্বাচন সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট, তথ্যচিত্র, ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদন, ইনফোগ্রাফিক ও সরল ভিডিও বার্তা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
কর্মশালার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পিআইবি পরিচালক কাজী মোহাম্মদ তৌহিদুল আনোয়ার। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যুগ্মসচিব রিয়াসাতুল ওয়াসিফ, জ্যেষ্ঠ প্রশিক্ষক গোলাম মুর্শেদ, ডিআরইউ-এর প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাহমুদ সোহেলসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। প্রশিক্ষণ কার্যক্রমে প্রিন্ট, ইলেকট্রনিক ও অনলাইন মাধ্যমে কর্মরত ৫০ জন সাংবাদিক অংশ নিচ্ছেন। পিআইবি কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রশিক্ষণে নির্বাচন কাভারেজের নীতি, তথ্য যাচাই, গুজব প্রতিরোধ, ডিজিটাল টুল ব্যবহার, সোর্স ম্যানেজমেন্ট, আইনি কাঠামো, নৈতিকতা এবং ব্যাখ্যামূলক প্রতিবেদনের কৌশলসহ সমসাময়িক বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নির্বাচনকেন্দ্রিক অপতথ্য সাধারণত সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, স্থানীয় পর্যায়ের অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক এবং ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। নির্বাচন কমিশন, প্রশাসন ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তর নিয়মিত তথ্য ব্রিফিং ও গণবিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করলেও গণমাধ্যমের কাঠামোবদ্ধ ও যাচাইকৃত তথ্যপ্রবাহ জনগণের কাছে অধিক গ্রহণযোগ্যতা পায়। ফলে গুজব নিরসনে গণমাধ্যমের ভূমিকা কেবল তথ্য সরবরাহেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তা সামাজিক আস্থার ক্ষেত্রেও প্রভাবক হিসেবে কাজ করে।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, বাংলাদেশের নির্বাচন প্রেক্ষাপটে গুজব ও অপতথ্য মোকাবিলা এখন কাঠামোবদ্ধ নীতি, ডিজিটাল মনিটরিং, গণশিক্ষা কার্যক্রম এবং সাংবাদিকদের ফ্যাক্ট-চেকিং সক্ষমতার সমন্বয়ে পরিচালিত হচ্ছে। তথ্যসচিবের আহ্বানকে এ সমন্বিত কাঠামোর একটি সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে, যেখানে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগের পাশাপাশি গণমাধ্যমকর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার বার্তা দেওয়া হয়েছে।
প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়া সাংবাদিকদের মতে, নির্বাচনকেন্দ্রিক সংবাদ পরিবেশনে দ্রুত তথ্য যাচাই, সোর্সের বিশ্বাসযোগ্যতা নির্ধারণ, ডিপফেক ও ম্যানিপুলেটেড কনটেন্ট শনাক্তকরণ, এবং সংশোধনী তথ্যকে আকর্ষণীয় কিন্তু নিরপেক্ষভাবে উপস্থাপন করার দক্ষতা বর্তমান সময়ে গুরুত্বপূর্ণ পেশাগত চাহিদা। পিআইবি কর্তৃপক্ষ জানায়, কর্মশালার দ্বিতীয় দিনে তথ্য যাচাই-সংক্রান্ত ব্যবহারিক সেশন, ডিজিটাল গুজব মনিটরিং কৌশল, এবং নির্বাচন প্রতিবেদনের কাঠামোগত বিশ্লেষণ অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, নির্বাচনের আগে ও নির্বাচনকালীন সময়ে অপতথ্য মোকাবিলায় বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে তথ্য-সমন্বয় সেল সক্রিয় রয়েছে। তবে জনগণের কাছে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে গণমাধ্যমের প্রাতিষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক, ভাষাগত দক্ষতা ও বিশ্বাসযোগ্যতার ক্ষেত্রকে অধিক কার্যকর মনে করা হয়। এ কারণে মাঠপর্যায়ের প্রচার, প্রযুক্তি-ভিত্তিক ভোটার শিক্ষা এবং গুজব নিরসনে সাংবাদিকদের সহায়তা কামনা করা হয়েছে।
প্রশিক্ষণ কর্মসূচি আগামী শনিবার (১০ জানুয়ারি) সমাপনী সেশনের মাধ্যমে শেষ হবে, যেখানে অংশগ্রহণকারী সাংবাদিকদের সনদ প্রদান করা হবে।