আন্তর্জাতিক ডেস্ক
পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় বেলুচিস্তান প্রদেশের খারান শহরে একযোগে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় হামলা ও দখলের চেষ্টাকালে সেনাবাহিনীর অভিযানে অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (১৫ জানুয়ারি) এ ঘটনা ঘটে। পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণমাধ্যম শাখা ইন্টার-সার্ভিসেস পাবলিক রিলেশনস (আইএসপিআর) এক বিবৃতিতে এ তথ্য জানিয়েছে।
আইএসপিআরের বিবৃতিতে বলা হয়, ১৫ থেকে ২০ জন সশস্ত্র ব্যক্তি খারান শহরের পুলিশ স্টেশন, ন্যাশনাল ব্যাংক অব পাকিস্তান এবং হাবিব ব্যাংক লিমিটেডে সমন্বিতভাবে হামলা চালানোর চেষ্টা করে। নিরাপত্তা বাহিনীর ভাষ্য অনুযায়ী, হামলাকারীরা ওই সময় ব্যাংক দুটি থেকে প্রায় ৩৪ লাখ পাকিস্তানি রুপি লুট করে নেয়। ঘটনার পরপরই নিরাপত্তা বাহিনী এলাকায় অভিযান শুরু করে এবং পাল্টা প্রতিরোধ গড়ে তোলে।
সেনাবাহিনীর দাবি অনুযায়ী, প্রাথমিক প্রতিরোধের মুখে হামলাকারীরা বিভিন্ন দিকে ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। এরপর খারান শহর ও আশপাশের এলাকায় পৃথক তিনটি স্থানে সংঘর্ষ হয়। এসব সংঘর্ষে মোট ১২ জন নিহত হয় বলে আইএসপিআর জানিয়েছে। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, অভিযানের পর থেকে এলাকায় ক্লিয়ারেন্স ও মপ-আপ কার্যক্রম চলমান রয়েছে, যাতে কোনো সশস্ত্র গোষ্ঠীর সদস্য বা তাদের সহায়তাকারীরা পালিয়ে যেতে না পারে।
আইএসপিআরের তথ্যমতে, হামলাকারীরা পাকিস্তান সরকারের ভাষায় ‘ফিতনা আল-হিন্দুস্তান’ নামে চিহ্নিত একটি সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত। পাকিস্তান সরকার দেশটির বেলুচিস্তান প্রদেশে সক্রিয় বিভিন্ন সশস্ত্র বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠীকে সামগ্রিকভাবে এই পরিভাষায় অভিহিত করে থাকে। বিবৃতিতে হামলার পেছনে বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতার অভিযোগও করা হয়েছে, যদিও এ বিষয়ে বিস্তারিত প্রমাণ বা নির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
পাকিস্তানের নিরাপত্তা পরিস্থিতিতে বেলুচিস্তান দীর্ঘদিন ধরেই একটি সংবেদনশীল অঞ্চল হিসেবে পরিচিত। প্রাকৃতিক সম্পদসমৃদ্ধ এই প্রদেশে অবকাঠামো উন্নয়ন, খনিজ সম্পদের বণ্টন, রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব এবং কেন্দ্রীয় সরকারের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। এসব ইস্যুকে কেন্দ্র করে সেখানে সশস্ত্র হামলা, নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষ এবং বেসামরিক স্থাপনায় আক্রমণের ঘটনা অতীতেও ঘটেছে।
আইএসপিআর জানায়, জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (ন্যাশনাল অ্যাকশন প্ল্যান) এবং ফেডারেল সরকারের অনুমোদিত ‘আজম-ই-ইস্তেহকাম’ ভিশনের আওতায় সন্ত্রাসবিরোধী অভিযান পরিচালিত হচ্ছে। এসব নীতির লক্ষ্য হিসেবে দেশের ভেতরে সশস্ত্র সহিংসতা প্রতিরোধ, চরমপন্থী নেটওয়ার্ক ভেঙে দেওয়া এবং রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। সংস্থাটি জানিয়েছে, বিদেশি পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত সন্ত্রাসবাদ সম্পূর্ণরূপে নির্মূল না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত থাকবে।
এদিকে খারান শহরের ঘটনার পর স্থানীয় প্রশাসন নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করেছে। গুরুত্বপূর্ণ সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত নিরাপত্তা মোতায়েন করা হয়েছে এবং শহরের বিভিন্ন প্রবেশপথে তল্লাশি বাড়ানো হয়েছে। তবে হতাহতের সংখ্যা, ক্ষয়ক্ষতি বা আটক ব্যক্তিদের বিষয়ে বেসামরিক প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলাদা কোনো বিস্তারিত তথ্য এখনো প্রকাশ করা হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, খারানে সাম্প্রতিক এই সংঘর্ষ বেলুচিস্তানে চলমান নিরাপত্তা চ্যালেঞ্জেরই প্রতিফলন। একদিকে নিরাপত্তা বাহিনীর অভিযান, অন্যদিকে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর হামলার চেষ্টা—এই দ্বন্দ্বময় পরিস্থিতি প্রদেশটির সামগ্রিক স্থিতিশীলতার ওপর প্রভাব ফেলছে। একই সঙ্গে আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর স্থাপনায় হামলার চেষ্টা দেশটির অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলছে।
পাকিস্তান সরকার ও সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের হামলা প্রতিরোধে গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে। তবে বেলুচিস্তানের দীর্ঘস্থায়ী রাজনৈতিক ও সামাজিক সমস্যার টেকসই সমাধান ছাড়া নিরাপত্তা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নতি কতটা সম্ভব—সে প্রশ্নও আলোচনায় রয়ে গেছে।