আবহাওয়া ডেস্ক
দেশজুড়ে চলমান শীতপ্রবাহের মধ্যেই একাধিক জেলায় মৃদু থেকে মাঝারি এবং মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার তথ্য জানিয়েছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসজুড়ে দেশে একাধিক তীব্র শৈত্যপ্রবাহ ধেয়ে আসতে পারে এবং কোনো কোনো অঞ্চলে তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে বলে দীর্ঘমেয়াদি পূর্বাভাসে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের বিশেষজ্ঞ কমিটির এক বৈঠকে জানুয়ারি মাসের দীর্ঘমেয়াদি এই পূর্বাভাস নির্ধারণ করা হয়। পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, চলতি জানুয়ারিতে দেশে দুই থেকে তিনটি মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার শৈত্যপ্রবাহ এবং এক থেকে দুটি মাঝারি থেকে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যেতে পারে। ওই সময় দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ৪ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নেমে আসার সম্ভাবনা প্রবল। বিশেষত উত্তরাঞ্চল, উত্তরবঙ্গ এবং নদী অববাহিকাসংলগ্ন এলাকাগুলোতে শীতের তীব্রতা সবচেয়ে বেশি অনুভূত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
পূর্বাভাসে আরও জানানো হয়, মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত সারা দেশে মাঝারি থেকে ঘন কুয়াশা পড়তে পারে, যা কোনো কোনো ক্ষেত্রে দুপুর পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। ঘন কুয়াশার কারণে সূর্যের আলো বাধাগ্রস্ত হওয়ায় দিনের সর্বোচ্চ তাপমাত্রা কমে আসবে এবং দিন ও রাতের তাপমাত্রার ব্যবধান সংকুচিত হবে। এতে শীতের অনুভূতি আরও তীব্র হয়ে উঠতে পারে। কুয়াশার এই স্থায়িত্ব ও ঘনত্বের প্রভাবে সড়ক, নৌ ও বিমান চলাচলে দৃষ্টিসীমা কমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, যা যোগাযোগ ব্যবস্থায় সাময়িক বিঘ্ন ঘটানোর আশঙ্কা তৈরি করে।
আবহাওয়াবিদ মো. মমিনুল ইসলাম জানিয়েছেন, জানুয়ারি মাসে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঁচটি পর্যন্ত শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। এর মধ্যে দুই থেকে তিনটি শৈত্যপ্রবাহ হবে মৃদু থেকে মাঝারি মাত্রার, যেখানে তাপমাত্রা ৮-১০ ডিগ্রি বা ৬-৮ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নামতে পারে। বাকি এক থেকে দুটি শৈত্যপ্রবাহ মাঝারি থেকে তীব্র রূপ নিতে পারে, যেখানে তাপমাত্রা ৪-৬ ডিগ্রি সেলসিয়াসে নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তিনি আরও উল্লেখ করেন, মাসজুড়ে গড় তাপমাত্রা স্বাভাবিক থাকার সম্ভাবনা থাকলেও শৈত্যপ্রবাহের দিনগুলোতে জনজীবনে স্থবিরতা, অর্থনৈতিক কার্যক্রমে গতি কমে যাওয়া এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধির মতো প্রভাব পড়তে পারে।
দেশের সাত জেলায় গত ২ জানুয়ারি শৈত্যপ্রবাহ বয়ে যাওয়ার তথ্যও দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। পরবর্তী ২৪ ঘণ্টার পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ৩ জানুয়ারি, শনিবার, দেশের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে, ফলে শীতের অনুভূতি কিছুটা কমে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে ৪ জানুয়ারি, রোববার, থেকে তাপমাত্রা পুনরায় হ্রাস পেতে পারে এবং শীতের তীব্রতা আবারও বৃদ্ধি পাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। আবহাওয়াবিদ শাহানাজ সুলতানা জানিয়েছেন, বর্তমানে শৈত্যপ্রবাহের বিস্তৃতি কিছুটা কমেছে এবং শনিবার পর্যন্ত এই ধারা অব্যাহত থাকতে পারে। তবে রোববার থেকে তাপমাত্রা আবার কমতে পারে এবং শৈত্যপ্রবাহ নতুন করে বিস্তার লাভ করতে পারে।
বাংলাদেশের আবহাওয়াগত বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী, শীতকালে শৈত্যপ্রবাহ সাধারণত দেশের উত্তর, উত্তর-পশ্চিম এবং মধ্যাঞ্চলের নিম্নভূমি ও নদী অববাহিকাসংলগ্ন এলাকায় বেশি সক্রিয় থাকে। হিমালয় সংলগ্ন অঞ্চলের শীতল বায়ুর প্রবাহ বাংলাদেশে প্রবেশের কারণে উত্তরবঙ্গে শীতের প্রকোপ তুলনামূলক বেশি অনুভূত হয়। চলতি মৌসুমেও একই প্রাকৃতিক বায়ুপ্রবাহ সক্রিয় থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। বিশেষত, পঞ্চগড়, দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, ঠাকুরগাঁও, রাজশাহী, এবং পাবনার মতো জেলাগুলোতে তাপমাত্রা তুলনামূলক কম থাকার প্রবণতা দেখা যায়। পাশাপাশি, পদ্মা, যমুনা, তিস্তা, ধরলা, ব্রহ্মপুত্র এবং মেঘনার অববাহিকায় জলীয় বাষ্পের ঘনত্ব বৃদ্ধি এবং তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সম্মিলিত প্রভাবে কুয়াশার স্থায়িত্ব বাড়তে পারে, যা শীতের অনুভূতিকে আরও তীব্র করে তোলে।
আবহাওয়া অফিসের সংজ্ঞা অনুযায়ী, কোনো অঞ্চলে তাপমাত্রা ৮.১ থেকে ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে নেমে গেলে তাকে মৃদু শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। তাপমাত্রা ৬.১ থেকে ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে সেটি মাঝারি শৈত্যপ্রবাহ এবং ৪.১ থেকে ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস হলে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ হিসেবে বিবেচিত হয়। তাপমাত্রা ৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নিচে নেমে গেলে তাকে অতি তীব্র শৈত্যপ্রবাহ বলা হয়। চলতি জানুয়ারির পূর্বাভাসে তাপমাত্রা তীব্র থেকে অতি তীব্র পর্যায়ে নেমে যাওয়ার মতো পরিস্থিতির সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া হয়নি।
শীত ও শৈত্যপ্রবাহের প্রভাবে জনস্বাস্থ্যে ঠান্ডাজনিত রোগ, বিশেষত শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমণ, নিউমোনিয়া, অ্যাজমার প্রকোপ বৃদ্ধি, শিশু ও বয়স্ক জনগোষ্ঠীর স্বাস্থ্যঝুঁকি বৃদ্ধি, এবং ত্বকজনিত সমস্যার মতো প্রভাব সাধারণত বেশি দেখা দেয়। এ ছাড়া, তীব্র শৈত্যপ্রবাহের সময় খেটে খাওয়া মানুষের কাজের সক্ষমতা হ্রাস, কৃষি উৎপাদনে শীতজনিত প্রভাব, বিশেষত বোরো বীজতলা, আলু, শীতকালীন সবজি এবং ফল উৎপাদনে সাময়িক ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। ঘন কুয়াশা ও তাপমাত্রা হ্রাসের কারণে ভোরের শিশিরপাতের পরিমাণ বেড়ে গেলে ফসলের পাতায় জলীয় স্তর জমে ছত্রাকজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব বৃদ্ধির ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বঙ্গোপসাগরে ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপের কোনো আশঙ্কা নেই বলে পূর্বাভাসে জানানো হলেও স্বাভাবিক বৃষ্টিপাতের সম্ভাবনা রয়েছে। শীতকালীন বৃষ্টিপাতের ক্ষেত্রে সাধারণত দেশের দক্ষিণ ও উপকূলীয় অঞ্চলে হালকা থেকে মাঝারি বৃষ্টি দেখা যায়, যা তাপমাত্রা হ্রাসের পরপরই শীতের অনুভূতি আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। যদিও ঘূর্ণিঝড় বা নিম্নচাপের মতো বড় ধরনের আবহাওয়াগত বিপর্যয়ের সম্ভাবনা নেই, তবু তাপমাত্রা হ্রাস, কুয়াশার স্থায়িত্ব, এবং শৈত্যপ্রবাহের পুনঃবিস্তার জনজীবন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় পর্যায়ক্রমিক প্রভাব ফেলতে পারে।
আবহাওয়া অধিদপ্তর সংশ্লিষ্ট সকল সংস্থা ও জনসাধারণকে চলমান আবহাওয়ার পূর্বাভাস নিয়মিত পর্যবেক্ষণ এবং শীতজনিত ঝুঁকি প্রশমনে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণের পরামর্শ দিয়েছে। সম্ভাব্য শৈত্যপ্রবাহের দিনগুলোতে স্বাস্থ্যসুরক্ষা, সড়ক ও নৌ চলাচলে সতর্কতা, এবং কৃষিক্ষেত্রে বোরো বীজতলা ও শীতকালীন ফসল সুরক্ষায় অতিরিক্ত যত্ন নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।