বাংলাদেশ ডেস্ক
ঢাকা, ৫ জানুয়ারি ২০২৬ — জুলাই অভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রায়েরবাজার কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা ১১৪ জন অজ্ঞাত ব্যক্তির মধ্যে আটজনের পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে শনাক্ত করা হয়েছে। সোমবার (৫ জানুয়ারি) সকালে রায়েরবাজার কবরস্থান এলাকায় সরকারের পক্ষ থেকে শনাক্ত ব্যক্তিদের নাম-পরিচয় প্রকাশ করা হয়। লাশ শনাক্তকরণ কার্যক্রম ও এর ফলাফল উপস্থাপন করেন শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান। তিনি জানান, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত মিনেসোটা প্রটোকল অনুসরণ করে ১১৪টি লাশ উত্তোলন, ময়নাতদন্ত, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, ডিএনএ প্রোফাইলিং ও পুনরায় কবরস্থ করার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে। সরকারি সূত্রে নিশ্চিত করা হয়েছে, শনাক্ত আটজন জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া এবং ওই সময় নিহত শহীদ হিসেবে তালিকাভুক্ত।
শিল্প উপদেষ্টা আদিলুর রহমান খান বলেন, মিনেসোটা প্রটোকল ও মিনেসোটা-সংশ্লিষ্ট মিনেসোটা প্রটোকল (২০১৬) নির্দেশিকা এবং জাতিসংঘ ঘোষিত মানদণ্ডের আলোকে লাশ উত্তোলন ও ময়নাতদন্ত কার্যক্রম পরিচালিত হয়েছে। তিনি জানান, এ কার্যক্রমে ‘মিনেসোটা প্রটোকল ফর দ্য ইনভেস্টিগেশন অব পটেনশিয়ালি আনলফুল ডেথ’–এর মূল নির্দেশনা—যথাযথ নথিপত্র সংরক্ষণ, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে ময়নাতদন্ত, ফরেনসিক বিশ্লেষণ, ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ ও চেইন অব কাস্টডি বজায় রাখা—কঠোরভাবে অনুসরণ করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, ১১৪ জনের মধ্যে আটজনের পরিচয় নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে এবং আরও একজনের পরিচয় শনাক্তের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
সরকারি ঘোষণায় শনাক্ত শহীদদের তালিকা প্রকাশ করা হয়। শনাক্ত আটজন হলেন—ময়মনসিংহের ফুলপুর উপজেলার মো. মাহিন মিয়া (২৫), শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার আসাদুল্লাহ (২৩), চাঁদপুরের মতলব উপজেলার পারভেজ বেপারী (২৪), পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার রফিকুল ইসলাম (২৫), মুন্সিগঞ্জের লৌহজং উপজেলার মো. সোহেল রানা (২৯), ফেনী সদর উপজেলার রফিকুল ইসলাম (৩০), কুমিল্লার দেবিদ্বার উপজেলার ফয়সাল সরকার (৩৫) এবং ঢাকার মুগদা এলাকার কাবিল হোসেন (৫১)। ময়নাতদন্ত ও ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফলের ভিত্তিতে এসব পরিচয় নিশ্চিত করা হয়। লাশ উত্তোলন ও ফরেনসিক পরীক্ষার পর নিহতদের কবরগুলো পুনরায় রায়েরবাজার কবরস্থানে সংরক্ষণ করা হয় এবং পরিচয় নিশ্চিত হওয়া কবরগুলো সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে হস্তান্তর প্রক্রিয়া শুরু হয়।
শিল্প উপদেষ্টা বলেন, “অজ্ঞাত শহীদদের পরিচয় ও মর্যাদা পুনঃপ্রতিষ্ঠাকে রাষ্ট্র তার নৈতিক দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করে। এ গুরুদায়িত্ব পালনে অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক দল পেশাদারিত্ব ও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড বজায় রেখে কাজ সম্পন্ন করেছে।” তিনি জানান, বাংলাদেশে একসঙ্গে এত সংখ্যক লাশ কবর থেকে উত্তোলনের ঘটনা এর আগে ঘটেনি। এ কার্যক্রম দেশের ফরেনসিক সক্ষমতা, আন্তঃবাহিনী সমন্বয়, ডিএনএ বিশ্লেষণ সক্ষমতা ও মানবাধিকার-সংশ্লিষ্ট তদন্ত প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সিআইডি প্রধান ছিবগাত উল্লাহ বলেন, ১১৪টি লাশ উত্তোলন ও পরীক্ষার কাজ ৭ ডিসেম্বর থেকে ২৭ ডিসেম্বর পর্যন্ত সিআইডির ফরেনসিক দলের নেতৃত্বে সম্পন্ন হয়েছে। তিনি জানান, ১১৪টি লাশের মধ্যে অনেকের শরীরে বুলেটের পিলেট ও গুলির আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ফরেনসিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, লাশগুলোর মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা, শারীরিক আঘাত, বুলেটের ক্ষতসহ বিভিন্ন কারণে মৃত্যু হওয়া ব্যক্তিরাও ছিলেন। তবে ডিএনএ প্রোফাইলিং ও ফরেনসিক ক্রস-ম্যাচিংয়ের মাধ্যমে আটজনকে আন্দোলনের সময় নিহত জুলাই শহীদ হিসেবে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। সিআইডি প্রধান বলেন, “গুলির আঘাত, পিলেট, বুলেটের ক্ষত ও অন্যান্য আলামত বিশ্লেষণের বিস্তারিত প্রতিবেদন পরবর্তী সময়ে পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক প্রকাশনায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।”
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক ই আজম (বীর প্রতীক) বলেন, “পরিচয় শনাক্তের ফলে নিহতদের পরিবার তাদের স্বজনের মৃত্যুর পরিণতি ও কবরের অবস্থান নিশ্চিতভাবে জানতে পারছে, যা নিখোঁজ ও অজ্ঞাত মৃত্যুর তদন্তের ক্ষেত্রে একটি মানবিক স্বস্তি তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।” সরকারি সূত্রে বলা হয়েছে, পরিচয় শনাক্ত হওয়া কবরগুলো সংশ্লিষ্ট পরিবারের কাছে বুঝিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে এবং কবরের নথি, অবস্থান ও ফরেনসিক পরীক্ষার সংশ্লিষ্ট তথ্য স্বজনদের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হচ্ছে।
লাশ উত্তোলন কার্যক্রম চলাকালে রায়েরবাজার কবরস্থান এলাকায় একটি অস্থায়ী মর্গ স্থাপন করা হয়। সেখান থেকেই ডিএনএ নমুনা সংগ্রহ, ফরেনসিক ডকুমেন্টেশন ও আলামত সংরক্ষণের কাজ পরিচালিত হয়। তদন্ত প্রক্রিয়ায় প্রতিটি লাশের ক্ষেত্রে পরিচয় শনাক্তকরণ, আলামত বিশ্লেষণ, নমুনা সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে ডিএনএ প্রোফাইলিং, তথ্য মিলিয়ে দেখা ও পুনরায় কবরস্থ করার ধাপগুলো পর্যায়ক্রমে সম্পন্ন করা হয়। সংশ্লিষ্ট ফরেনসিক সূত্রে বলা হয়েছে, প্রতিটি নমুনা সংগ্রহ ও বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন ‘চেইন অব কাস্টডি’ বজায় রাখা হয়েছে, যাতে পরীক্ষার ফলাফল ও আলামতের গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নাতীত থাকে।
অনুষ্ঠানে প্রধান উপদেষ্টার স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সহকারী অধ্যাপক ডা. সায়েদুর রহমান, পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম, সিআইডি প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি ছিবগাত উল্লাহ, পুলিশের আইজি বাহারুল আলম এবং সিআইডির ফরেনসিক দলের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। এছাড়া পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা, সংশ্লিষ্ট তদন্ত টিম ও সরকারের একাধিক দপ্তরের প্রতিনিধিরা কার্যক্রমের উপস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করেন। পরবর্তী ধাপে পরিচয় শনাক্ত হওয়া কবরগুলো পরিবারের কাছে হস্তান্তরের পর সিআইডির ফরেনসিক বিভাগ অজ্ঞাত মৃত্যুর তদন্ত-সংশ্লিষ্ট বাকি লাশগুলোর পরিচয় শনাক্তের কার্যক্রম অব্যাহত রাখবে বলে জানানো হয়েছে।