আন্তর্জাতিক ডেস্ক
তুরস্ক সৌদি আরব ও পারমাণবিক ক্ষমতাধারী পাকিস্তানের মধ্যকার পারস্পরিক প্রতিরক্ষা চুক্তিতে যোগদানের জন্য সক্রিয় তদবির চালাচ্ছে। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে মধ্যপ্রাচ্যে একটি নতুন সামরিক জোট গড়ে উঠতে পারে, যা উপসাগরীয় অঞ্চল এবং ইরানকে ঘিরে ক্রমবর্ধমান উত্তেজনার মধ্যে গঠন হচ্ছে।
মার্কিন সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গের শুক্রবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তুরস্ক, সৌদি আরব ও পাকিস্তানের মধ্যে চলমান আলোচনা ‘উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির’ অবস্থানে রয়েছে এবং চুক্তি হওয়ার সম্ভাবনা ‘ব্যাপক’। আলোচনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সূত্রের বরাত দিয়ে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
একই সময় ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা আরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের দিকে এগোচ্ছে। বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, পাকিস্তান সৌদি আরব ও তুরস্ক-সমর্থিত সুদানের সেনাবাহিনীর সঙ্গে ১৫০ কোটি ডলারের অস্ত্রচুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে। এই চুক্তির আওতায় পাকিস্তান সুদানের সেনাপ্রধান আবদেল ফাত্তাহ আল-বুরহানের বাহিনীকে ১০টি কারাকোরাম-৮ হালকা আক্রমণ জেট, নজরদারি ও কামিকাজে হামলার জন্য ২০০টির বেশি ড্রোন এবং উন্নত আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সরবরাহ করবে। পাকিস্তানের অবসরপ্রাপ্ত এয়ার মার্শাল আমির মাসুদ জানান, চুক্তিটি কার্যত চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং এর মধ্যে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে।
যদি ত্রিপক্ষীয় প্রতিরক্ষা চুক্তি বাস্তবায়িত হয়, তাহলে সৌদি আরব, পাকিস্তান ও তুরস্ক অঞ্চলটির তিনটি গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রকে এক সুতায় বাঁধবে। সৌদি আরব আরব বিশ্বের একমাত্র জি-২০ অর্থনীতি, মুসলিম বিশ্বের দুই পবিত্র নগর মক্কা ও মদিনার নিয়ন্ত্রণকারী দেশ, পাকিস্তান পারমাণবিক ক্ষমতাধারী মুসলিম দেশ এবং তুরস্ক ন্যাটোর দ্বিতীয় বৃহত্তম সেনাবাহিনী ও ইউরোপ ও এশিয়ার সংযোগস্থলে অবস্থিত।
ইসলামাবাদ ও আঙ্কারা দ্রুতগতিতে অস্ত্র উৎপাদনকারী ও রপ্তানিকারক দেশে পরিণত হচ্ছে। তুরস্ক ইতোমধ্যেই ইউক্রেনে ব্যবহারের জন্য ড্রোন সরবরাহ করেছে এবং সিরিয়া ও লিবিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মিত্র হিসেবে উপস্থিত রয়েছে। পাকিস্তানও সামরিক সরঞ্জামের রপ্তানি বাড়ানোর চেষ্টা করছে; গত ডিসেম্বরে লিবিয়ার ন্যাশনাল আর্মির সঙ্গে ৪০০ কোটি ডলারের চুক্তি স্বাক্ষর করে ১৬টি জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমানসহ বিভিন্ন সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহের পরিকল্পনা করেছে। এছাড়া সৌদি আরবের প্রায় ২০০ কোটি ডলারের ঋণকে জেএফ-১৭ যুদ্ধবিমান ক্রয়ে রূপান্তর করার বিষয়ে আলোচনাও চলছে।
ঐতিহাসিকভাবে পাকিস্তান সৌদি আরব ও তুরস্কের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। তবে তুরস্ক ও সৌদি আরবের সম্পর্ক সবসময় মসৃণ ছিল না। আরব বসন্তের সময় তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তাইয়েপ এরদোয়ান গণ-আন্দোলনের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করেছিলেন, যা সৌদি আরব তাদের রাজতান্ত্রিক শাসনের জন্য হুমকি হিসেবে দেখেছিল। প্রায় এক দশক আগে লিবিয়ায় দুই দেশের অবস্থান ভিন্ন ছিল।
মধ্যপ্রাচ্যের জোট রাজনীতিও নিয়মিত পরিবর্তন হয়েছে। গাজায় সংঘটিত সংঘর্ষ, লেবানন, সিরিয়া ও ইরানের ওপর বিস্তৃত হামলার প্রেক্ষাপটে তুরস্ক ও সৌদি আরব সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৌশলগতভাবে আরও কাছাকাছি এসেছে। ২০২১ সালের দিকে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক মেরামতের চেষ্টা শুরু হয়, যার মধ্যে সিরিয়ার মত উত্তপ্ত ইস্যুতেও সমন্বয় লক্ষ্য করা যায়। উভয় দেশ একই দিকে সুদানের গৃহযুদ্ধেও সমর্থন জ্ঞাপন করেছে।
একই সময়ে সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অংশীদারিত্বে ফাটল লক্ষ্য করা গেছে। ইয়েমেনে সৌদি আরব ইউএই সমর্থিত বিচ্ছিন্নতাবাদী সাউদার্ন ট্রানজিশনাল কাউন্সিলের বিরুদ্ধে বিমান হামলা চালিয়েছে এবং তাদের নিয়ন্ত্রণ থেকে বিতাড়িত করেছে। এই ভৌগোলিক ও কৌশলগত পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ধরনের সামরিক ও কূটনৈতিক বিন্যাস তৈরি হতে পারে।