অর্থ বাণিজ্য ডেস্ক
দেশের ভবিষ্যৎ অর্থনৈতিক গতিপথ নির্ধারণে শক্ত ও টেকসই ভিত্তি গড়ে তুলতে সরকার কাজ করছে বলে জানিয়েছেন মহেশখালী ইন্টিগ্রেটেড ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (মিডা)-এর নির্বাহী চেয়ারম্যান চৌধুরী আশিক মাহমুদ বিন হারুন। তিনি বলেন, অন্তর্বর্তী সরকারের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো আগামী নির্বাচিত সরকারের জন্য এমন একটি কার্যকর কাঠামো প্রস্তুত করা, যাতে তারা দায়িত্ব গ্রহণের পর উন্নয়ন কার্যক্রম নির্বিঘ্নে এগিয়ে নিতে পারে।
রাজধানীর একটি হোটেলে ‘সাসটেইনেবল ব্লু ইকোনমি, কানেকটিভিটি ও রেজিলিয়েন্স ফর সাইডস’ শীর্ষক নর্থইস্ট ইন্ডিয়ান ওশান আঞ্চলিক সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি। সংলাপটি যৌথভাবে আয়োজন করে সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের ওশান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট (ওপিআরআই), মিডা এবং পিস অ্যান্ড পলিসি সল্যুশনস (পিপিএস)।
চৌধুরী আশিক মাহমুদ বলেন, বাংলাদেশের স্থলভাগের আয়তন প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার বর্গকিলোমিটার হলেও বঙ্গোপসাগরে দেশের সামুদ্রিক এলাকা বিস্তৃত প্রায় ১ লাখ ৬৪ হাজার বর্গকিলোমিটার জুড়ে। আয়তনের দিক থেকে সমুদ্রভিত্তিক সম্পদের পরিসর বড় হলেও গভীর সমুদ্র মৎস্য আহরণ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও সামুদ্রিক গবেষণায় বিনিয়োগ ও নীতিগত গুরুত্ব স্থলভিত্তিক খাতের তুলনায় অনেক কম। এই বৈষম্য কাটিয়ে উঠতে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি জানান, জাতীয় নির্বাচনের আর মাত্র ৩০ দিন বাকি। এ প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান কাজ হলো নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য একটি ব্যবহারযোগ্য ও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম রেখে যাওয়া। চলমান এই সংলাপ ও কর্মশালাগুলো ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য প্রাথমিক দিকনির্দেশনা ও নীতিগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন। তার ভাষায়, প্রস্তাবিত ব্লুপ্রিন্ট সমুদ্রসম্পদের টেকসই ব্যবহারের মাধ্যমে উপকূলীয় এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখতে পারে।
অনুষ্ঠানে ওপিআরআই-এর প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক মিৎসুতাকু মাকিনো বলেন, এই আঞ্চলিক সংলাপের মূল লক্ষ্য হলো জলবায়ু পরিবর্তনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব মোকাবিলায় সম্মিলিত দৃষ্টিভঙ্গি তৈরি করা। তিনি বলেন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়, প্রবাল প্রাচীরের ক্ষয় এবং উপকূলীয় ভাঙন কেবল পরিবেশগত সংকট নয়; এগুলো সমুদ্রনির্ভর মানুষের জীবিকা, আঞ্চলিক অর্থনীতি ও সাংস্কৃতিক কাঠামোর জন্যও বড় হুমকি।
ভারত মহাসাগরের কৌশলগত গুরুত্ব তুলে ধরে অধ্যাপক মাকিনো বলেন, ‘গ্রেট মিডল বে’ নামে পরিচিত এই অঞ্চলটি ৩৩টিরও বেশি দেশকে সংযুক্ত করে রেখেছে এবং এটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের একটি গুরুত্বপূর্ণ করিডর। তিনি জানান, জাপানের মোট জ্বালানি আমদানির প্রায় ৮০ শতাংশ এই অঞ্চলের সামুদ্রিক পথের ওপর নির্ভরশীল। এ কারণে সমুদ্র নিরাপত্তা, টেকসই উন্নয়ন এবং সমুদ্র সংরক্ষণকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নেওয়ার ওপর জাপান গুরুত্ব দিচ্ছে।
মিডার সদস্য কমোডর তানজিম ফারুক বলেন, দেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে অবস্থিত মহেশখালী একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকূলীয় এলাকা। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে মিডা প্রতিষ্ঠার পর থেকে আগামী ৩০ বছর ও তার পরবর্তী সময়কে সামনে রেখে মহেশখালীকে দেশের শিল্পোন্নয়নের একটি ফ্ল্যাগশিপ এলাকায় রূপান্তরের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এই পরিকল্পনায় বিশ্বমানের অবকাঠামো, অর্থনৈতিক অঞ্চল ও পরিকল্পিত নগরায়ণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উন্নয়ন নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন সাসাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের ওশান পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সিনিয়র রিসার্চ ফেলো ড. এমাদুল ইসলাম। তিনি বলেন, সমুদ্র বৈশ্বিক অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি। পৃথিবীর অতিরিক্ত তাপের প্রায় ৯০ শতাংশ সমুদ্র শোষণ করে এবং চার বিলিয়ন মানুষের জন্য খাদ্য ও অক্সিজেনের প্রধান উৎস হিসেবে কাজ করে। তবে একই সঙ্গে তিনি সতর্ক করেন, সমুদ্র এখন নজিরবিহীন চাপের মুখে রয়েছে।
ড. এমাদুল ইসলাম জানান, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পানির নিচের তাপমাত্রা বেড়ে যাওয়া এবং জীববৈচিত্র্যের ক্ষয় উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। তার মতে, প্রায় ১ হাজার ৬০০ প্রজাতি বর্তমানে বিলুপ্তির ঝুঁকিতে রয়েছে। প্রবাল প্রাচীরের ক্ষয় এবং প্লাস্টিক দূষণের মতো সমস্যাগুলো সমুদ্রের স্বাভাবিক ভারসাম্যকে মারাত্মকভাবে ব্যাহত করছে। তিনি আরও বলেন, দীর্ঘদিন নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় উপকূলীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ সীমিত ছিল; টেকসই ব্লু ইকোনমি বাস্তবায়নে তাদের অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি।