আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ভেনেজুয়েলার সাম্প্রতিক পরিস্থিতিকে কেন্দ্র করে কলম্বিয়া–ভেনেজুয়েলা সীমান্তে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করতে সামরিক বাহিনী মোতায়েনের নির্দেশ দিয়েছেন কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো। যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের পর ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো আটক হয়েছেন—এমন দাবির প্রেক্ষাপটে শনিবার এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। কলম্বিয়ার রাজধানী বোগোতায় সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
কলম্বিয়ার প্রেসিডেন্ট কার্যালয় থেকে জানানো হয়, সীমান্তবর্তী অঞ্চলে সম্ভাব্য অস্থিরতা, শরণার্থী প্রবাহ এবং নিরাপত্তা ঝুঁকি বিবেচনায় রেখে সেনা ও অন্যান্য নিরাপত্তা বাহিনীকে সতর্ক অবস্থানে থাকতে বলা হয়েছে। দেশটির দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলে ভেনেজুয়েলার সঙ্গে দীর্ঘ সীমান্ত রয়েছে, যেখানে অতীতেও রাজনৈতিক সংকটের সময় নিরাপত্তা ও মানবিক চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।
প্রেসিডেন্ট পেত্রো যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক পদক্ষেপকে লাতিন আমেরিকার সার্বভৌমত্বের ওপর আঘাত হিসেবে উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, একতরফা সামরিক উদ্যোগ এই অঞ্চলে অস্থিতিশীলতা বাড়াতে পারে এবং সাধারণ মানুষের জন্য নতুন মানবিক সংকট তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। একই সঙ্গে তিনি বলেন, ভেনেজুয়েলার চলমান পরিস্থিতির টেকসই সমাধান কেবল সংলাপ ও কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমেই সম্ভব।
সরকারি বক্তব্যে বলা হয়, সীমান্তে সামরিক উপস্থিতি বাড়ানো হলেও কলম্বিয়া সরাসরি কোনো সামরিক সংঘাতে জড়াতে চায় না। বরং সীমান্ত এলাকার নাগরিকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অবৈধ অস্ত্র ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর চলাচল রোধ এবং সম্ভাব্য শরণার্থী আগমন মোকাবিলাই এ সিদ্ধান্তের মূল লক্ষ্য।
নিকোলাস মাদুরো আটক হওয়ার বিষয়ে প্রেসিডেন্ট পেত্রো আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো মন্তব্য করেননি। তবে আঞ্চলিক রাজনীতিতে কলম্বিয়া ও ভেনেজুয়েলা সরকারের মধ্যে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঘনিষ্ঠতা বেড়েছে। বামপন্থী নেতৃত্বাধীন কলম্বিয়া সরকার ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট সমাধানে সংলাপের পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে এবং আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা শিথিলের আহ্বানও জানিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক তৎপরতা ও ভেনেজুয়েলার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির পরিবর্তন প্রতিবেশী দেশগুলোর জন্য সরাসরি প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে কলম্বিয়া ইতোমধ্যে লাখো ভেনেজুয়েলান অভিবাসীকে আশ্রয় দিয়েছে। নতুন করে সংঘাত বা অস্থিরতা তৈরি হলে সীমান্ত দিয়ে মানুষের অনুপ্রবেশ বাড়তে পারে, যা কলম্বিয়ার অর্থনীতি ও সামাজিক সেবাব্যবস্থার ওপর চাপ সৃষ্টি করবে।
কলম্বিয়ার সীমান্তবর্তী বিভাগগুলোতে অতীতে মাদক পাচার, অবৈধ খনন ও সশস্ত্র গোষ্ঠীর তৎপরতা ছিল একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ভেনেজুয়েলার রাজনৈতিক সংকট তীব্র হলে এসব গোষ্ঠী পরিস্থিতির সুযোগ নিতে পারে—এমন আশঙ্কাও প্রকাশ করেছেন নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা। সে কারণেই আগাম সতর্কতা হিসেবে সামরিক বাহিনী মোতায়েনকে সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ হিসেবে দেখছে।
আঞ্চলিক কূটনীতিতে কলম্বিয়া বরাবরই লাতিন আমেরিকার অভ্যন্তরীণ সমস্যার সমাধানে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ ও আলোচনার ওপর জোর দিয়ে আসছে। প্রেসিডেন্ট পেত্রোর সাম্প্রতিক বক্তব্যেও সেই অবস্থানের প্রতিফলন দেখা যায়। তিনি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন, যেন ভেনেজুয়েলা সংকটকে সামরিক সংঘাতে পরিণত না করে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সমাধানের পথ খোঁজা হয়।
বর্তমান পরিস্থিতিতে কলম্বিয়া সরকার সীমান্তে নজরদারি অব্যাহত রাখার পাশাপাশি মানবিক প্রস্তুতিও জোরদার করছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলোকে সম্ভাব্য শরণার্থী ঢল মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। পরিস্থিতির গতিপ্রকৃতি অনুযায়ী পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ করা হবে বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।