আবহাওয়া ডেস্ক
ঢাকায় আজ সকাল থেকে ঘন কুয়াশা বিরাজ করছে। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা কুয়াশার আস্তরণে ঢাকা থাকায় সূর্যের আলো দেখা যায়নি এবং দৃশ্যমানতা হ্রাস পেয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আজ ঢাকা ও এর পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের আকাশ অস্থায়ীভাবে মেঘলা থাকতে পারে এবং এ সময় হালকা থেকে মাঝারি ধরনের কুয়াশা অব্যাহত থাকতে পারে।
৪ জানুয়ারি সকাল ৭টা থেকে পরবর্তী ৬ ঘণ্টার আবহাওয়ার পূর্বাভাসে জানানো হয়, কুয়াশার ঘনত্ব দিনভাগের প্রথমার্ধ পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে। অধিদপ্তরের পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, আজ সকাল ৬টায় ঢাকার তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে ১২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস, যা চলতি শীত মৌসুমে রাজধানীর জন্য তুলনামূলকভাবে নিম্ন তাপমাত্রা হিসেবে বিবেচিত। একই সময়ে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ ছিল ৯৭ শতাংশ, যা কুয়াশা সৃষ্টির অনুকূল পরিবেশ নির্দেশ করে।
আবহাওয়া বিশেষজ্ঞদের মতে, সাধারণত শীত মৌসুমে রাতের তাপমাত্রা কমে গেলে ভূমি-সংলগ্ন বাতাস দ্রুত শীতল হয় এবং আপেক্ষিক আর্দ্রতা ১০০ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছালে জলীয়বাষ্প ঘনীভূত হয়ে কুয়াশা তৈরি করে। ঢাকায় আজকের কুয়াশার উচ্চ ঘনত্বের অন্যতম কারণ হলো বাতাসে অতিরিক্ত আর্দ্রতা এবং বায়ুমণ্ডলের নিম্নস্তরে তাপমাত্রার উল্টোমুখী স্তর (Temperature Inversion) সৃষ্টি, যেখানে উপরের স্তরের তুলনায় নিচের স্তর বেশি শীতল থাকে এবং বায়ু চলাচল কমে যাওয়ায় কুয়াশা দীর্ঘ সময় আটকে থাকে।
পূর্বাভাসে আরও বলা হয়েছে, উত্তর ও উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে ঘণ্টায় ৫ থেকে ১২ কিলোমিটার বেগে বাতাস প্রবাহিত হতে পারে। এই ধরনের শীতল বাতাস সাধারণত হিমালয়-সংলগ্ন অঞ্চল থেকে প্রবাহিত শুষ্ক ও ঠান্ডা বায়ুর অংশ, যা বাংলাদেশে শীত মৌসুমের তাপমাত্রা হ্রাসে ভূমিকা রাখে। তবে দিনের বেলা বায়ুপ্রবাহ কিছুটা বাড়লে কুয়াশা ধীরে ধীরে পাতলা হতে পারে এবং এর প্রভাবে দিনের তাপমাত্রা সামান্য বৃদ্ধি পেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রাজধানীতে কুয়াশা ও নিম্ন তাপমাত্রার প্রভাব ইতোমধ্যে জনজীবন ও যোগাযোগ ব্যবস্থায় প্রতিফলিত হচ্ছে। ভোর ও সকালের দিকে দৃশ্যমানতা কম থাকায় বিমান ও সড়ক যোগাযোগে বিলম্বের আশঙ্কা থাকে। সাধারণত ২০০ মিটারের নিচে দৃশ্যমানতা নেমে গেলে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড্ডয়ন ও অবতরণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব পড়ে এবং প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা বিধি অনুসারে ফ্লাইট পরিচালনায় সময় সমন্বয় করা হয়। একইভাবে, ঢাকা-ময়মনসিংহ, ঢাকা-টাঙ্গাইল, ঢাকা-আরিচা ও ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়কপথে যানবাহন ধীরগতিতে চলাচল করে এবং দুর্ঘটনা এড়াতে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বনের প্রয়োজন হয়।
শীত মৌসুমে ঘন কুয়াশা স্বাস্থ্যঝুঁকিও বৃদ্ধি করে। বাতাসে উচ্চ আর্দ্রতা, ধূলিকণা ও অন্যান্য ভাসমান কণার সঙ্গে কুয়াশার সংমিশ্রণে শ্বাসতন্ত্রজনিত সমস্যা, বিশেষ করে হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস ও শীতজনিত সর্দি-কাশির প্রকোপ বাড়তে পারে। প্রবীণ, শিশু এবং শ্বাসকষ্টজনিত রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা এ সময় অধিক ঝুঁকিতে থাকেন। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা সাধারণত এ ধরনের আবহাওয়ায় উষ্ণ পোশাক পরিধান, ভোরে বাইরে চলাচল সীমিত রাখা এবং প্রয়োজনে মাস্ক ব্যবহারের পরামর্শ দিয়ে থাকেন, কারণ কুয়াশার মধ্যে ধূলিকণা ও দূষণ উপাদান সহজে শ্বাসনালিতে প্রবেশ করতে পারে।
কৃষি ও পরিবেশ বিশ্লেষকদের মতে, কুয়াশা ফসলের ওপর মিশ্র প্রভাব ফেলে। বোরো ধানের চারা এবং আলু, টমেটো, শীতকালীন শাকসবজি ও সরিষা জাতীয় ফসলের জন্য সকালের কুয়াশা কিছু ক্ষেত্রে উপকারী হতে পারে, কারণ এটি মাটির আর্দ্রতা ধরে রাখতে সহায়তা করে এবং সেচের চাহিদা কমায়। তবে অতিরিক্ত কুয়াশা ও দীর্ঘ সময় সূর্যালোক না থাকলে পাতায় ছত্রাকজনিত রোগ (Fungal Infection) ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়, বিশেষ করে আলু ও টমেটোতে ‘লেট ব্লাইট’ (Late Blight) রোগের প্রবণতা দেখা দিতে পারে। এজন্য কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত শীতকালে নিয়মিত ফসল পর্যবেক্ষণ, রোগ প্রতিরোধী ছত্রাকনাশক প্রয়োগ এবং জমিতে পানি জমে না থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্বারোপ করে।
বাংলাদেশে শীত মৌসুম সাধারণত নভেম্বরের শেষ থেকে ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি পর্যন্ত স্থায়ী থাকে। এই সময়ে দেশের উত্তরাঞ্চলে শৈত্যপ্রবাহের প্রবণতা বেশি থাকলেও, রাজধানী ঢাকাসহ মধ্যাঞ্চলে কুয়াশা তুলনামূলকভাবে বেশি দেখা যায়, বিশেষ করে ডিসেম্বরের শেষ ভাগ ও জানুয়ারির প্রথম সপ্তাহে। ঢাকার ভৌগোলিক অবস্থান, নদী ও জলাশয়ের ঘনত্ব, বায়ুপ্রবাহের মৌসুমি দিক পরিবর্তন এবং নগরীর উচ্চ আর্দ্রতার মাত্রা কুয়াশা সৃষ্টির প্রধান অনুঘটক হিসেবে কাজ করে।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের দীর্ঘমেয়াদি বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঢাকায় শীতকালে সর্বনিম্ন তাপমাত্রা সাধারণত ৮ থেকে ১৪ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে ওঠানামা করে এবং জানুয়ারিতে আর্দ্রতার গড় মাত্রা ৮৫ থেকে ৯৮ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে, যা কুয়াশার ঘনত্ব বৃদ্ধিতে সহায়ক। এল নিনো ও লা নিনা–জাতীয় বৈশ্বিক জলবায়ু প্রভাব, উত্তর-পশ্চিম দিক থেকে আগত শীতল বায়ু এবং বঙ্গোপসাগর থেকে প্রবাহিত আর্দ্র বাতাসের মিলিত প্রভাবে কুয়াশা ও তাপমাত্রা–উভয় ক্ষেত্রেই মৌসুমি তারতম্য পরিলক্ষিত হয়।
দিনের বেলা তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেতে পারে বলে পূর্বাভাসে উল্লেখ থাকলেও, সন্ধ্যা থেকে রাতের দিকে পুনরায় তাপমাত্রা কমে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে দিনের উষ্ণতার পরও রাতের শীতের তীব্রতা অপরিবর্তিত থাকতে পারে। আবহাওয়া অধিদপ্তর নিয়মিত ৩–৬ ঘণ্টা ও ২৪ ঘণ্টা–ভিত্তিক পূর্বাভাসের মাধ্যমে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং শীত মৌসুমের যোগাযোগ ও স্বাস্থ্যঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বনের ওপর গুরুত্বারোপ করে থাকে।
কুয়াশা ও মেঘলা আকাশের এই পরিস্থিতি রাজধানীর দৈনন্দিন কার্যক্রমে সাময়িক প্রভাব ফেলতে পারে বলে ধারণা করা হলেও, বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কুয়াশা ধীরে ধীরে কমে গিয়ে স্বাভাবিক দৃশ্যমানতা ফিরে আসতে পারে।