আন্তর্জাতিক ডেস্ক
যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে জনবহুল নগরী নিউইয়র্ক সিটিতে নতুন মেয়র হিসেবে বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি) জোহরান মামদানির শপথগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। নতুন বছরের প্রথম প্রহরে এক ভাবগম্ভীর অনুষ্ঠানে তিনি এই দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ৮০ লাখেরও বেশি জনসংখ্যার এই মহানগরীর প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে তাঁর পদার্পণকে স্থানীয় এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে ব্যাপক গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। মামদানিকে নিউইয়র্কের ইতিহাসে প্রথম মুসলিম মেয়র হিসেবে উল্লেখযোগ্য করে নেওয়া হয়েছে।
জোহরান মামদানি ৩৪ বছর বয়সে এই দায়িত্ব গ্রহণ করায় তিনি সবচেয়ে কম বয়সী মেয়র হিসেবেও গণ্য হচ্ছেন। শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন নগর প্রশাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাবৃন্দ, দলের নেতারা, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের প্রতিনিধি ও সাধারণ নাগরিকরা। অনানুষ্ঠানিকভাবে দীর্ঘকালীন ঐতিহ্য থাকায় ১ জানুয়ারি মধ্যরাতে নবনির্বাচিত মেয়রের শপথ গ্রহণের রীতি বজায় রাখা হয় যাতে প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তর প্রক্রিয়ায় কোনো অস্পষ্টতা না থাকে।
শপথ অনুষ্ঠানটির জন্য মামদানি একটি ঐতিহাসিক সাবওয়ে স্টেশনকে স্থান হিসেবে বেছে নেন, যা গত শতাব্দীর মাঝামাঝি বন্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে এটি একটি পর্যটন আকর্ষণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। তাঁর ট্রানজিশন টিম জানায়, এই ভূগর্ভস্থ স্টেশনটি বাছাই করার মাধ্যমে সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের সঙ্গে তার একাত্মতা ও তাঁদের দৈনন্দিন জীবনের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্য রাখা হয়েছে। ঐতিহাসিক এই পরিবেশটি শহরের নীচে দৈনন্দিনভাবে চলাচল করা মানুষের সঙ্গে নতুন প্রশাসনের সংযোগের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
শপথের পর থেকে মামদানির দাপ্তরিক কার্যক্রম শুরু হওয়ার পাশাপাশি তিনি তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রশাসনিক অগ্রাধিকারগুলো বাস্তবায়ন করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন। সাবেক আইনপ্রণেতা হিসেবে গণ্য এই মেয়র নির্বাচনী প্রচারণায় বেশকিছু জনকল্যাণমূলী প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছিলেন, যেগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো উচ্চ ভাড়া নিয়ন্ত্রণ বা স্থগিত করা, নিউইয়র্কবাসীর জন্য বিনামূল্যে গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু করা এবং সার্বজনীন শিশু যতœ বা চাইল্ডকেয়ার সুবিধা নিশ্চিত করা।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, মামদানির এই জনকল্যাণমুখী কর্মসূচিগুলো শুধুমাত্র নিউইয়র্ক নগরীর জন্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের সামগ্রিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে পাথুরে নীচে একটি নতুন কর্মসূচির মডেল তৈরি করতে পারে। বিশেষত, আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে ডেমোক্র্যাটিক পার্টির কাছে এটি পজিটিভ আচরণ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা মনে করেন। তবে বিশাল বাজেটের এসব প্রকল্প বাস্তবায়নে আর্থিক চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলা করাই হবে তাঁর মেয়রের প্রথম ও প্রধান পরীক্ষা।
মেয়রের এগুলো বাস্তবায়নযোগ্য করার জন্য নগরটির বাজেট এবং রাষ্ট্রীয়-ফেডারেল সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। নিউইয়র্ক সিটির আর্থিক কাঠামো এবং রাজস্ব সংগ্রহের নিয়ম অনুযায়ী বিনামূল্যে গণপরিবহন বা ভাড়া নিয়ন্ত্রণের মতো উদ্যোগগুলো বাস্তবায়নের আগে ব্যাপক দিকনির্দেশনা ও আর্থিক পরিকল্পনার প্রয়োজন হবে। এই ব্যবস্থাগুলো কিভাবে বাস্তবায়িত হবে এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংস্থান কীভাবে নিশ্চিত করা হবে সে সম্পর্কে বিস্তারিত প্রস্তাবনার উপরে ইতিমধ্যেই নগর প্রশাসনের ভেতর আলোচনা চলছে।
জোহরান মামদানির জয়কে যুক্তরাষ্ট্রের প্রগতিশীল রাজনীতির একটি বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার রক্ষা ও সমাজের ধন-বৈষম্য হ্রাসের যে অঙ্গীকার তিনি করেছেন, তা নিউইয়র্কের মতো একটি বৈশ্বিক বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে কেমন ফল দেবে, তা দেখার জন্য সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পর্যবেক্ষকরা নজর রাখছেন। পাশাপাশি তাঁর শাসনামলে অভিবাসী অধিকার, সম্প্রদায়িক সম্প্রীতি ও ধর্মীয় সহাবস্থান সম্পর্কে কোনো নতুন পরিবর্তন আসে কি না, তা নিয়েও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আলোচনা শুরু হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রে মুসলিম সম্প্রদায়ের নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ইতিহাস বেশ দীর্ঘ, তবে কেন্দ্রীয় বা স্থানীয় ক্ষমতার উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছানো বহু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে একজন মুসলিম নেতা হিসেবে নিউইয়র্কের মতো একটি বহুজাতিক ও বহুধাবিভক্ত শহরের মেয়র পদে জোহরান মামদানির উন্নীত হওয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের একটি প্রতীক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
তবে তাঁর নেতৃত্বে বাস্তবায়িত নীতি ও কর্মসূচিগুলোর প্রভাব সময়ের সাথে প্রতিপন্ন হবে। বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সহাবস্থান, অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার সমতা, নাগরিকসেবার মান উন্নয়ন এবং নাগরিকদের জীবনযাত্রার মান বৃদ্ধি—এসব ক্ষেত্রেই তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা যাচাইয়ের মুখে পড়বে। এসব নীতির বাস্তবগত প্রভাব এবং নগরবাসীর ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব কি হবে, তা নিয়ে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ক্ষেত্রের বিশ্লেষকরা ভবিষ্যতে বিস্তারিত মূল্যায়ন করবেন।