রাজনীতি ডেস্ক
ঢাকা, বৃহস্পতিবার—বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ভারতের সঙ্গে তাঁর ‘গোপন বৈঠক’ অনুষ্ঠিত হয়েছে—এমন দাবিতে প্রকাশিত সংবাদকে বিভ্রান্তিকর উল্লেখ করে তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন। একই সঙ্গে তিনি যাচাই ছাড়া তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। বৃহস্পতিবার (১ জানুয়ারি ২০২৬) সকাল ৯টা ১৯ মিনিটে তাঁর ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে এ অবস্থান ব্যাখ্যা করা হয়।
পোস্টে ডা. শফিকুর রহমান জানান, আন্তর্জাতিক সংবাদ সংস্থা রয়টার্সকে বুধবার দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তাঁকে প্রশ্ন করা হয়েছিল—প্রতিবেশী দেশ ভারতসহ বিভিন্ন রাষ্ট্রের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কোনো যোগাযোগ, বৈঠক বা আলোচনার সম্পর্ক আছে কি না। জবাবে তিনি উল্লেখ করেন, ২০২৫ সালের মাঝামাঝি অসুস্থতার পর চিকিৎসা শেষে বাসায় ফেরার সময় দেশ-বিদেশের বিভিন্ন কূটনৈতিক প্রতিনিধিসহ নানা শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিরা সৌজন্য সাক্ষাৎ করতে এসেছিলেন। সে সময় ভারতের দুজন কূটনীতিকও তাঁর বাসায় তাঁকে দেখতে আসেন এবং সৌজন্যমূলক আলাপ করেন। তিনি স্পষ্ট করে বলেন, এটি ছিল অসুস্থতা-পরবর্তী সৌজন্য সাক্ষাৎ, কোনো দ্বিপক্ষীয় স্বার্থসংশ্লিষ্ট আনুষ্ঠানিক বৈঠক বা রাজনৈতিক আলোচনা নয়।
দলীয় সূত্রে জানা যায়, ওই সাক্ষাতে উপস্থিত ভারতীয় কূটনীতিকদের সঙ্গে আলোচনার সময় জামায়াতের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল যে, অন্যান্য রাষ্ট্রের কূটনীতিকদের আগমনের তথ্য যেমন আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়েছে, একইভাবে ভারতীয় প্রতিনিধিদের আগমনের তথ্যও প্রকাশ করা হবে। তবে ভারতীয় কূটনীতিকরা তখন তাঁদের আগমনের বিষয়টি প্রচার না করার অনুরোধ জানান। এর প্রেক্ষিতে জামায়াত আমির তাঁদের জানান, ভবিষ্যতে যখনই দুই দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক বৈঠক বা আলোচনা হবে, তা উন্মুক্তভাবে প্রকাশ করা হবে এবং এতে গোপনীয়তার কোনো সুযোগ নেই।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশে নির্বাচনী রাজনীতি, ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ও কূটনৈতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে ‘গোপন বৈঠক’ জাতীয় শব্দের ব্যবহার প্রায়ই বিতর্ক তৈরি করে। বিশেষ করে প্রতিবেশী ভারতের সঙ্গে যে কোনো রাজনৈতিক দলের যোগাযোগ নিয়ে গণপরিসরে উচ্চ সংবেদনশীলতা কাজ করে। অতীতে বাংলাদেশে বিভিন্ন সরকার ও রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ভারতীয় প্রতিনিধিদের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বৈঠক নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা ব্যাখ্যা ও পাল্টা ব্যাখ্যা দেখা গেছে। তবে আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক প্রথা অনুযায়ী, রাষ্ট্রীয় প্রতিনিধিদের সৌজন্য সাক্ষাৎকে আনুষ্ঠানিক বৈঠক বা ‘দ্বিপক্ষীয় আলোচনা’ হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয় না—যতক্ষণ না তা নির্দিষ্ট এজেন্ডা, প্রটোকল ও দলিল-নথির মাধ্যমে অনুষ্ঠিত হয়।
সাবেক কূটনীতিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা বলেন, সৌজন্য সাক্ষাতে কূটনীতিকদের উপস্থিতি এবং তাদের সঙ্গে রাজনৈতিক নেতাদের আলাপচারিতা আন্তর্জাতিক সম্পর্কের নিয়মিত অংশ। কোনো রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতার অসুস্থতার খোঁজ নিতে কূটনৈতিক পর্যায়ে সাক্ষাৎ একটি স্বাভাবিক ঘটনা এবং এতে কূটনৈতিক শিষ্টাচার ছাড়া অন্য কোনো আনুষ্ঠানিক এজেন্ডা না থাকলে তাকে ‘গোপন বৈঠক’ বলা সঠিক নয়।
এদিকে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে আরও বলা হয়েছে, সংবাদে ‘গোপন বৈঠক’ দাবি করা হলে তা দলটির রাজনৈতিক অবস্থান, কূটনৈতিক স্বচ্ছতার প্রতিশ্রুতি এবং জনপরিসরে তাদের যোগাযোগ নীতির বিষয়ে ভুল বার্তা দেয়। বিশেষ করে আগামী জাতীয় নির্বাচন ঘিরে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে আস্থা, স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে জনপরিসরে বাড়তি মনোযোগ কাজ করছে। এই প্রেক্ষাপটে তথ্যের যথাযথ যাচাই ছাড়া কূটনৈতিক সাক্ষাৎকে ভিন্ন ব্যাখ্যায় উপস্থাপন রাজনৈতিক ভুল বোঝাবুঝি, আস্থার সংকট ও অপ্রয়োজনীয় বিতর্ক উসকে দিতে পারে।
বাংলাদেশে বর্তমানে কূটনৈতিক তৎপরতা আগের তুলনায় বহুমাত্রিক রূপ পেয়েছে। ২০২৫ সালে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পর বিভিন্ন রাষ্ট্রের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের সঙ্গে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সংলাপ, সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময়ের পরিধি বৃদ্ধি পায়। নির্বাচন পর্যবেক্ষণ, সাইবার নিরাপত্তা, বাণিজ্য, সীমান্ত সহযোগিতা, আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও অভিবাসনসহ নানা বিষয়ে আন্তর্জাতিক সংলাপ নিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তবে এ ধরনের সংলাপ আনুষ্ঠানিক কাঠামো, রাষ্ট্রীয় প্রটোকল ও ঘোষিত এজেন্ডার মাধ্যমে সম্পন্ন হলে তা গণমাধ্যমে নিয়মিতভাবে প্রকাশের দৃষ্টান্তও রয়েছে।
গণমাধ্যম বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, রাজনৈতিক সংবাদে ভারসাম্য, প্রেক্ষাপট ব্যাখ্যা ও তথ্যসূত্রের স্বচ্ছতা বজায় রাখা বাংলাদেশের জাতীয় দৈনিকগুলোর প্রধান পেশাগত মানদণ্ড। যাচাইহীন তথ্য বা আংশিক বক্তব্য থেকে অনুমাননির্ভর সংবাদ তৈরি হলে তা পাঠকের মধ্যে বিভ্রান্তি ছড়ায় এবং গণমাধ্যমের প্রতি আস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তাই যে কোনো রাজনৈতিক বক্তব্য, বিশেষ করে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও কূটনৈতিক সাক্ষাৎ-সংক্রান্ত তথ্য প্রচারের আগে একাধিক নির্ভরযোগ্য সূত্রে যাচাই, সময়কাল নির্ধারণ, সাক্ষাতের ধরন ব্যাখ্যা এবং প্রাসঙ্গিক পটভূমি তুলে ধরা অত্যাবশ্যক।
এ প্রেক্ষাপটে ডা. শফিকুর রহমান তাঁর পোস্টে বলেন, ভবিষ্যতে প্রকৃত তথ্য ও প্রেক্ষাপট যাচাই ছাড়া বিভ্রান্তিকর সংবাদ পরিবেশন না করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখা প্রয়োজন। তাঁর মতে, রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বিষয়ে সংবাদ পরিবেশনে নির্ভুলতা ও তথ্যগত স্বচ্ছতা বজায় রাখা জাতীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও রাজনৈতিক আস্থার জন্য গুরুত্বপূর্ণ।