আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ব্যক্তিগত বাসভবন মার-আ-লাগোতে সম্প্রতি রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের সমাধানসহ আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বিষয়ক গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ২২ ডিসেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প দাবি করেন, তিনি আটটি আন্তর্জাতিক সংঘাত প্রতিরোধ করেছেন এবং নতুন ধরনের ভারী অস্ত্রে সজ্জিত যুদ্ধজাহাজ নির্মাণের পরিকল্পনা ঘোষণা করেন।
ট্রাম্প বলেন, পাকিস্তান ও ভারতের মধ্যে সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাতও তিনি নিরসন করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনির এবং প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ এই প্রক্রিয়ায় ট্রাম্পের ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। গত জানুয়ারিতে দ্বিতীয়বার হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্প অন্তত ১০বার প্রকাশ্যে মুনিরের ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন।
২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে মিসরের শারম আল-শেখে গাজায় যুদ্ধবিরতি চুক্তি শেষে ট্রাম্প পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী ও সেনাপ্রধানকে উল্লেখ করে মুনিরকে ‘প্রিয় ফিল্ড মার্শাল’ হিসেবে অভিহিত করেন। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই সম্পর্কের উষ্ণতা পাকিস্তানের নতুন ভূরাজনৈতিক অবস্থানের জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
২০২৫ সালের ভারত–পাকিস্তান চার দিনের সশস্ত্র সংঘাতকে যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তান কূটনৈতিক সম্পর্কের একটি টার্নিং পয়েন্ট হিসেবে দেখছে। দুই দেশের আকাশযুদ্ধের ফলাফল বিবেচনায় থাকলেও ইসলামাবাদের কূটনৈতিক ব্যবহারকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। পাকিস্তানের সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী খুররম দস্তগীরের মতে, এই সংঘাত মুনিরকে আন্তর্জাতিকভাবে পরিচিত করেছে এবং ওয়াশিংটনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছে।
মে ২০২৫ সালে কাশ্মীরে বেসামরিক নাগরিক হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ভারত–পাকিস্তান উত্তেজনা বৃদ্ধি পায়। হামলা ও পাল্টা হামলার তিন দিনের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হয়। পাকিস্তান এই প্রক্রিয়ার জন্য মার্কিন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পকে স্বীকৃতি দিয়েছে এবং তাঁকে নোবেল শান্তি পুরস্কারের মনোনয়নের প্রস্তাবও আসে। তবে ভারত জানিয়েছে, সমঝোতা দ্বিপক্ষীয় আলোচনার মাধ্যমে হয়েছে। ট্রাম্প একাধিক ভাষণে এ দাবি পুনরায় উল্লেখ করেন যে তিনিই যুদ্ধ স্থগিত করেছেন এবং পাকিস্তানের দাবিকে সমর্থন করেছেন।
যুক্তরাষ্ট্র–পাকিস্তান সম্পর্কের ধারা পরিবর্তনের প্রেক্ষাপটে দেখা যাচ্ছে, একসময় মার্কিন প্রধান মিত্র হলেও ‘সন্ত্রাসবিরোধী যুদ্ধে’ দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগে সম্পর্ক উত্তপ্ত ছিল। দ্বিতীয় মেয়াদে হোয়াইট হাউসে ফেরার পর ট্রাম্প পাকিস্তানের সঙ্গে কূটনৈতিক সহযোগিতায় নতুন সুর সেট করেছেন। বিশেষত কাবুলে বোমা হামলাকারীদের ধরতে পাকিস্তানের সহায়তা প্রশংসার যোগ্য বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
ভারতের সঙ্গে যুদ্ধের পর আসিম মুনিরকে ফিল্ড মার্শাল পদে উন্নীত করা হয় এবং ‘চিফ অব ডিফেন্স ফোর্সেস’ (সিডিএফ) পদ যুক্ত হয়। ফলে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনী তার অধীনে আসে। পদোন্নতি ও ক্ষমতার প্রসার নিয়ে সমালোচনা থাকলেও বৈদেশিক কূটনীতিতে পাকিস্তান উল্লেখযোগ্য লাভবান হয়েছে। এছাড়া বাংলাদেশ, মধ্য এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে কূটনৈতিক যোগসূত্র বৃদ্ধি, সৌদি আরবের সঙ্গে প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং গাজায় শান্তিরক্ষা বাহিনীতে অংশগ্রহণ পাকিস্তানকে নতুন ভূরাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
বিদেশে কূটনৈতিক সাফল্য থাকলেও দেশের অভ্যন্তরে সহিংসতা, স্বাধীনতা সংকোচন এবং ২৭তম সংবিধান সংশোধন নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। আসিম মুনিরের অতিরিক্ত ক্ষমতা, ইমরান খানের কারাবাস এবং বেলুচিস্তান সংকটসহ বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ ইস্যু বহির্বিশ্বের সফলতা আড়ালে থেকে যাচ্ছে। তবে সমর্থকেরা যুক্তি দেন, রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা ও সংস্কারে সেনাবাহিনীর শক্তিশালী ভূমিকা প্রয়োজন ছিল।